১১ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
head banar ads here

মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় হজ্বের গুরুত্ব

সোমবার, ৩১/০৮/২০১৫ @ ১০:২৮ অপরাহ্ণ

Spread the love

image
আরটিএমনিউজ২৪ডটকম ডেস্ক: হজ্ব এর অর্থ হলো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে শরিয়তের নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থান তথা বায়তুল্লাহ শরীফ এবং সংশ্লিষ্ট স্থান সমূহের জিয়ারত করা। (শামী, দ্বিতীয় থন্ড) হজ্ব ইসলামের পঞ্চ রুকনের অন্যতম একটি রুকন।

যারা অর্থিক ও শারীরিক দিক থেকে সামর্থ্যবান তাদের উপর জীবনে একবার হজ্ব করা ফরজ। প্রাচীন কাল থেকেই আল্লাহ প্রেমিক বান্দারা বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব করে আসছেন। হযরত আদম (আ.) আল্লাহ পাকের হুকুমে এবং জিবরাঈল (আ.) এর দেখানো পদ্ধতিতে বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করেছেন। এর পর থেকে এ ঘরের তাওয়াফ ও জিয়ারত অব্যাহত থাকে। হযরত নুহ (আ.) এর সময়কার মহাপ্লাবন এবং তুফানে বায়তুল্লাহ শরীফ লোক চক্ষুর অন্তরালে চাপা পড়ে যায়। এর পর আল্লাহর হুকুমে হযরত ইবরাহীম (আ.) কাবা শরীফ পুনর্নিমাণ করেন এবং আল্লাহর হুকুমে হযরত ইবরাহীম (আ.) এবং হযরত ইসমাঈল (আ.) কাবা শরীফের তাওয়াফ সহ হজ্বের যাবতীয় কর্মকান্ড সমাধা করেন। অতঃপর মহান রাব্বুল আলামীন গোটা বিশ্ব জাহানকে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সামনে তুলে ধরেন এবং তিনি আল্লাহর হুকুমে ‘মাকামে ইবরাহীম’ অথবা ‘জাবালে আবু কুবাইস’ নামক পাহাড়ে দাঁড়িয়ে দুই কানে আঙ্গুল রেখে ডানে-বামে এবং পূর্ব ও পশ্চীমে মুখ করে ঘোষণা করেন, ‘‘লোক সকল! তোমাদের পালন কর্তা নিজের গৃহ নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের উপর সেই গৃহের হজ্ব ফরজ করেছেন।

তোমরা সবাই পালন কর্তার আদেশ পালন কর।” ইবরাহীম (আ.) এর সেই আহবান থেকে ই হজ্বের উৎপত্তি। সেই আহবান থেকে আজ পর্যন্ত কয়েক হাজার বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে কাবাঘরের তাওয়াফ করে যাচ্ছে।

কেউ স্থলপথে কেউ জলপথে কেউ আকাশ পথে এসে হজ্ব করছে। দিন যত যাচ্ছে বায়তুল্লাহর পানে আগমন কারীর সংখ্যা তত বাড়ছে। এমনকি হযরত ইবরাহীম (আ.) এর পরে যত নবী-রাসূল দুনিয়াতে এসেছেন সবাই বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ সহ হজ্বের যাবতীয় কাজ সমাধা করেছেন।
-তাফসীরে ইবনে কাসীর

জাহিলিয়াতের যুগেও লোকেরা বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ ও জিয়ারত করত। তবে তারা তাওয়াফ করত জাহিলী নিয়মে। এতে অনেক অশ্লীল কর্মকান্ড ও তারা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। নবম হিজরীতে রাসূল (সা.) এর নির্দেশে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.) এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরামের একটি দল হজ্ব পালন করেন আর এ বছর থেকেই ইসলামের বিধান অনুসারে এবং হযরত ইবরাহীম (আ.) প্রবর্তিত নিয়ম অনুসারে হজ্বের বিধিবিধান প্রবর্তন করা হয়। মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতির প্রতীক হল পবিত্র হজ্ব।

ইসলামী জীবন দর্শনের উপর পূর্ণ অটল ও অবিচল থাকা হলো হজ্বের প্রধান শিক্ষা। মুসলমানরা পরকালকে বিশ্বাস করে, সাদা-কালো, ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, রাজা-প্রজা ও দেশ-গোত্রের ভেদাভেদ ইসলামে নেই। সব মুসলমান একে অপরের ভাই, একই আল্লাহর বান্দা, একই রাসূলের আদর্শের অনুসারী বা উম্মত, একই কোরআনের বিশ্বাসী, একই কাবার প্রভুর পূজারী।

এ বিশ্বাসের এক বাস্তব অনুশীলন হল পবিত্র হজ্ব। হজ্বের একটি অন্যতম তাৎপর্যও শিক্ষা হলো গোটা উম্মাহ তথা মুসলিম মিল্লাতের বৃহত্তর ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা বা প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা।

হজ্বের মধ্যে ধর্মীয় ও পার্থিব অনেক উপকার রয়েছে যা সংক্ষেপে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে “ যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।” (সূরা হজ্ব-২৮) হজ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফযিলত হলো- রাসূল (সা.) বলেন, “তোমরা হজ্ব ও উমরা পালন কর কারণ হজ্ব ও উমরা দুটি জিনিসকে ধ্বংস করে দেয়- দারিদ্র্যতা এবং গুনাহ।” এ কারণে হজ্ব করে কেউ দেউলিয়া হয়েছে এমন নজীর কোথাও পাওয়া যাবে না।

সুতরাং যাদের আর্থিক সামর্থ্য এবং শারীরিক শক্তি রয়েছে তাদের জন্য আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করার চেয়ে মহৎ এবং কল্যাণকর কাজ দুনিয়াতে আর কিছু নেই।

পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ঘর হল কাবা গৃহ তথা মসজিদে হারাম। পবিত্র কোরআনে কাবাগৃহ কে ‘বায়তে আতিক’ তথা স্বাধীন মুক্ত ঘর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো এ ঘরের এত মর্যাদা যে, দুনিয়ার কোন পরাশক্তি বা কোন কাফের অত্যাচারী এ ঘর ধ্বংস করতে পারবে না। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘‘আল্লাহ কাবা ঘর কে কাফের ও অত্যাচারীদের অধিকার থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।’’ ইয়েমেনের খৃষ্টান রাজা আবরাহা কাবা ঘরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজ দেশে একখানা কাবা নির্মাণ করেছিলেন কিন্তু কেউ সেই কাবা জিয়ারতের জন্য পা বাড়ায়নি। অবশেষে তিনি বিশাল এক হস্তী বাহিনী নিয়ে কাবাঘর ধ্বংস করার জন্য এসেছিলেন, রাব্বুল আলামীন আবাবীল নামক এক প্রকার ছোট্ট পাখী দ্বারা তাকে ধবংস করে দেন।
কাবা শরীফের ভিতরে এখনো অনেক আবাবীল পাখী অবস্থান করে, এরাও সেই আবাবীলের বংশধর বলে জনশ্র“তি আছে। হয়ত মহান রাব্বুল আলামীন কাবাঘর এবং পবিত্র মক্কা নগরীর নিরাপত্তার জন্য এখনো সেই আবাবীলদের নিয়োজিত রেখেছেন যারা অত্যাচারী আবরাহাকে ধবংস করেছিল। এই কাবাগৃহ মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র।

মক্কা থেকে ৯ মাইল দূরে হরমের সীমানার বাইরে আরাফার ময়দান অবস্থিত। এখানে হযরত আদম ও হাওয়ার দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরে মিলন ঘটেছিল এ জন্য এ ময়দান কে আরাফার ময়দান বলা হয়। এখানে ইবরাহীম (আ.) এর প্রতিষ্ঠিত একখানা বিরাট মসজিদ রয়েছে। একে বলা হয় মসজিদে নামিরাহ।

ময়দানের এক প্রান্তে অবস্থিত জাবালে রাহমাত, যেখানে হেরা গুহা অবস্থিত। জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ এ ময়দানে মুসলমানদের বিরাট সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সুবিশাল সম্মেলনে ভাষণ দেন ইমামূলমু’মিনীন বা মুসলমানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।

এ ভাষণের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হলো মুসলিম বিশ্বের ঐক্য সংহতি এবং বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। এখানে মুসলমানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববাসীকে আহবান জানান। সকল প্রকার হানাহানী বিবাদ-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে বিশ্বনবীর উম্মতদেরকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপদেশ প্রদান করেন। ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির সুমহান আদর্শ তুলে ধরেন বিশ্বের সামনে। সে ভাষণ শ্রবণ করাও হজ্বের একটি অবশ্যপালনীয় বিষয়।

হজ্বের মৌসুমে আরাফার ময়দানে মুসলিম মিল্লাতের যে বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এতে উপস্থিত থাকেন লক্ষ লক্ষ হাজীদের সাথে খাদীমে হারমাইন শরীফাইন সহ আরবের রাজা-বাদশাহগণ এবং বিশ্বের ৫৮টি মুসলিম দেশের প্রধান বা শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। এখানে তাদের উপস্থিতিতে বিশ্ব শান্তি, সমৃদ্ধি ও মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে বিশ্বশান্তির মর্মবাণী ঘোষণা করেন ইমামুল মুসলিমীন।

বর্তমান সময়ে ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ঘোষণা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে গোটাবিশ্বে। শ্রবণ করে বিমুগ্ধ হয় বিশ্বের শান্তিপ্রিয় জনতা। মুসলিম বিশ্বের বিশ্বনেতারা ও সেই শান্তির বাণী শ্রবণ করেন।

তবে বর্তমান বিশ্বনেতাদের অন্ত করণে সেই শান্তির বাণী খুব কমই প্রবেশ করে। তাদের হৃদয়ে তেমন পরিবর্তন আনতে পারে না আরাফার ময়দানের দরাজ কন্ঠের বয়ান। যার দরুন হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা পালন করলেও ‘আরাফার ঘোষণা’ বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করেন না তারা পৃথিবীতে। আর এ কারণেই বিশ্বশান্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিশ্ববাসী। দুনিয়া জুড়ে নির্যাতিত মুসলমানদের আর্তনাদ শুনেও তাদের অন্তর ব্যথিত হয় না।

গোটা মুসলিম বিশ্বের অবস্থা আজ খুবই নাজুক। সারা বিশ্ব জোড়ে চলছে মুসলিম নির্যাতন। আধুনিক বিজ্ঞানের যতসব মারণাস্ত্র সবগুলোরই পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে কেবল মুসলমানদের উপর। ‘মুসলমানদের মানবাধিকার থাকতে নেই’ অলিখিত ভাবে এ নিয়ম চালু করেছে বিশ্ব মোড়লেরা। ফিলিস্তিন ইরাক মায়ানমার ও চীনের নির্যাতিত মুসলিম জনপদগুলো হচ্ছে এর জ্বলন্ত প্রমাণ। ফিলিস্তিন গাজা আজ বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।

ফিলিস্তিন, মিসর, ইরাক, আফগানিস্তান ও মাযানমারের মুসলমানরা প্রতিদিন লড়াই করছে মৃত্যুর সাথে। ইয়াহুদী খৃষ্টান ও বৌদ্ধরা উচ্ছেদ করে দিচ্ছে তাদের ভিটেমাটি থেকে। ইরাক-ফিলিস্তিন, মায়নমার সহ নির্যাতিত মুসলিম জনপদগুলোর মুসলমান মা বোনদের ইজ্জত রক্ষা করতে আজ গোটা দুনিয়া ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

ইহুদী-খ্রিষ্টান সৈন্যদের বর্বরতা থেকে নিজেদের সতীত্ব রক্ষা করতে এসব জনপদের তরুণীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। অথচ কারো এদিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই, কেউ যেন দেখেও দেখছে না। যারা সারা দুনিয়ার মানুষকে শান্তির বাণী শুনায়, গণতন্ত্রের কথা বলে, মানবাধিকারের সওদাগরী করে এদের নেতৃত্বেই চলছে সারা বিশ্বে মুসলিম নির্যাতন আর এদেরকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে তাগুতের ক্রীড়নক মুসলিম নামধারী শাসকেরা।

৫৮টি মুসলিম দেশের কারো সাহস নেই আঙ্গুল তুলে কথা বলার, মাথা খাড়া করে সাম্রাজ্যবাদীদের এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করার কেউনেই পৃথিবীতে। এ পরিস্থিতিতে আরাফার ময়দানে মুসলমানদের সুবিশাল জমায়েতের গুরুত্ব অনেক। এখান থেকে বিশ্বশান্তির যে দিকনির্দেশনা আসবে তা বাস্তবায়ন করা সময়ের অনিবার্য দাবী।

তাছাড়া হজ্ব উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলেম উলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ মক্কাশরীফ ও মদীনা শরীফে একত্রিত হবেন। আমরা আশা করব মুসলিম বিশ্বের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদেরা আলোচনায় মিলিত হবেন এবং মুসলিম বিশ্বের পাস্পরিক ঐক্য, সংহতির উপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে বিশ্বনেতারা এমন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবেন যাতে বিশ্বের মুসলমানগণ কুফরী শক্তির অন্যায় আগ্রাসন থেকে মুক্তি পেতে পারে, রুখে দাঁড়াতে পারে মজলুম মুসতাদআফীন জনতা।

আমাদের প্রত্যাশা আসন্ন হজ্ব থেকে বিশ্বনেতারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন। আরাফার ঘোষণা বাস্তবায়নে তারা সচেষ্ট হবেন।

বিশ্ব শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতি মনোাযাগী হবেন। পারস্পরিক কলহ বিবাদ ভুলে নতুন করে মিল্লাতের কথা ভাববেন। ফিলিস্তিনের গাজা সহ মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রতি নজর দেবেন। কাবুল, কান্দাহার, জেরুজালেম, আলআকসা, বাগদাদ, বসরা, কারবালা ও কাশ্মীরের কান্না থামাতে এগিয়ে আসবেন।

এবারের আরাফার ময়দানের ভাষণ হবে বিশ্বের তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রচন্ড বিদ্রোহ, মুসলিম মিল্লাতের ঐক্য-সংহতি এবং শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।

লেখক: ওয়ালিউর রহমান
আরটিএমনিউজ২৪ডটকম/ একে