২৩শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১১ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
head banar ads here

আলোচিত বড় ছেলে নাটক ও কিছু কথা

সোমবার, ১১/০৯/২০১৭ @ ৮:২৮ অপরাহ্ণ

Spread the love
আলোচিত বড় ছেলে নাটক ও কিছু কথা

আলোচিত বড় ছেলে নাটক ও কিছু কথা

মাহমুদুল হাসান শাকুরী

বড় ছেলে নাটকটা খুব মনযোগ দিয়ে দেখেছি। সত্য বলছি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমার আবেগ তলানীতে। ঠিক সেই সময়ে নিজের অজান্তে চোখে পানি এসেছে। সামাজের মধ্যবিত্ত পরিবাবারের বড় ছেলেদের জীবনের একটা পার্ট উঠে এসেছে। যা সবার হৃদয় স্পর্শ করেছে। এর চেয়েও ভয়াভহ বাস্তবতা আছে মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলেদের। কিন্তু পরিবারের বড় ছেলেদের কলিজা আর সবার চেয়ে একটু বেশী বড় এবং রক্তটা একটু বেশী গাড় লাল তাই নিজেদের কষ্টের কথাগুলো আত্মসম্মানকে পুঁজি করে কাউকে বুঝতে দেয় না।

আমি অবাক হই যাদেরকে আমরা শ্রদ্ধা করি এমন বুদ্ধিমানেরা বড় ছেলে নাটক দেখে আবেগ তাড়িত হয়ে নির্বোধেরমত তার কঠিন বাস্তব সময়ের কথা সোস্যাল মিডিয়াতে বলে সবার সস্তা সহানুভূতি কুড়ানোর চেষ্টা করছে। অথচ তারা জানে না, এখন যে বা যারা তাদের কষ্টের ইতিহাস শুনে বাহবা দিচ্ছে একটু পড়েই বলবে, লোকটা একটা ফকিন্নির বাচ্চা ফকিন্নি! ফকিন্নির বাচ্চা আজ বড় বড় কথা কয় কিন্তু একসময় কি কষ্ট করেই না দিন পাড় করছে! খাইয়া না খাইয়া এতদূর আসছে! এটা কোন জীবন হলো! কষ্ট করে অভাবের সংসারে বড় হইছে বলে শালার কলিজা নাই! এই সেই ফকিন্নির পুৎ! আগে কষ্ট করছে আর এখন কিছু টাকা কামাইয়া আমাগো সমান হইতে আসছে…

এমন এমন কথা বলবে যা শুনলে নিজে উপর নিজের রাগ উঠবে। মনে চাইবে মরে যাই। অনেক এসব জেনে বুঝে এমনকি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আজ আবেগ তাড়িত হয়ে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করছে সহানুভ’তির আশায়। যে সহানুভ’তির বিনিময়ে আত্মসম্মান বিকিয়ে দিতে হয় তাহলে কি দরকার এমন সস্তা সহানুভূতির?

শুধু একটা কথা বলি আমিও বাড়ির বড় ছেলে। এমন কি মধ্যবিত্ত পরিবারের। কিন্তু কোন মন খারাপের গল্প নেই আমার। সব মেনে নেই নিয়তি আর ভালো লাগা থেকে।

পরিবারের জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগে। মনে লাগে প্রশান্তি তাই পরিবারের সুখ আর আনন্দের জন্য রক্ত ঘাম করতেও আনন্দ লাগে। পরিবারের জন্য নিজের শত ব্যথা আর কষ্টকে চেপে হাসতে সাহস লাগে। কাপুরুষেরা বড় ছেলে হয়ে জন্মাতে পারে না। জন্মালেও নিজের সম্মান নিয়ে বাচতে পারে না।

পরিবারের বড় ছেলেরা যতটা স্বাধীনতা আর অধিকার নিয়ে জন্মায় তার ছিটে ফোটাও আর পাচটা সন্তান পায় না। আমি ছোটবেলায় যেই আদর আর ভালোবাসা পেয়েছি তার দশ ভাগের এক ভাগও নাকি বাকি পাচ ভাই-বোন পায়নি এমনটা আম্মুর ভাষ্য।

সংক্ষেপে তার একটা বর্নণা দেই, আব্বু ঠিকমত ড্রেস কিনে দেবার সুযোগ পেতো না। ঢাকায় থাকতেন চাচ্চুরা আর মামা। তারা নিয়ে আসতেন। ছোটবেলা থেকে নানা বাড়ি থাকা হতো বেশী। তখন সেখানে যান চলাচলের উপযুক্ত কোন রাস্তা ছিলো না। অসুস্থ হলে নানাভাই আমাকে কাধে করে গোপালপুর থেকে শিবচরের ভদ;্রাসন বাজার কিংবা জাজিরার কাজিরহাট অথবা গঙ্গা নগর বাজার মাইলের পর মাইল হেটে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন।

নানাভাইর কর্মস্থল ছিলো শিবচরের কাদিরপুর। বাড়ি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে! যেতে আসতে ১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। এত পরিশ্রম করে নিজের কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত ছুটিহীন যাতায়াত করা সত্ত্বেও শুধু আমার জন্য প্রতি সপ্তাহে বাদ দিতেন না কাজিরহাট, চান্দেরচর বাজার, শিবচর বাজার, ভদ্রাসন বাজার, নুরুবাইন্নার হাট, তাহের মাদবরের বাজার, লাউখোলা হাট, জয়নগর কিংবা গঙ্গা নগর বাজার। এসব হাট থেকে নানাভাই আমার জন্য নতুন কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন মাস্ট।

আর আদরের কথা কি বলবো, মামা বাড়িতে বেড়ে উঠেছি। নানা-নানীর কোন ছোট সন্তান ছিলো না। মামা পড়াশুনার জন্যে ছোটবেলা থেকে বাড়ির বাইরে। আর আমি তাদের অতি আদরের বড় মেয়ের বড় ছেলে। আমার জন্য কি না করেছে তারা। একটা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল ছিলেন নানা। কিন্তু আমার ব্যবহৃত কাপড় আর পো¯্রাবে ভেজা কাপড় ধোয়ার সময় এসব পদ-পদবী তার মনে থাকতো না। প্রতিদিন সকালে তার কর্মক্ষেত্র যাওয়ার পূর্বে নদীতে গোসল করতে যেতেন। সেই সাথে আমার ময়লা কাপড়-চোপড় সব ধুয়ে নিয়ে আসতেন।

শুধু আমার জন্য নানাভাই গরু কিনেছিলেন। গরু লালন-পালনের লোকের অভাবে বিক্রি করে দিলেও দুধের যোগান কমেনি। প্রতিদিন শুধু আমার জন্য দুই লিটার দুধ রোজ করা ছিল। বিশটার উপর খেজুর গাছের অফুরন্ত রসের গুড়, আনলিমিটেড মুড়ি, খৈ, চিড়া।

নানা বাড়িতে ছিলো গোলা ভরা ধান। পিঠা বানারো জন্য বেশি সংরক্ষণ করা হতো সেদ্ধহীন আলো ধান। যার বড় অংশ আমার জন্য। আমার জন্য পিঠা বানানো ছিলো একমাত্র আন্টির প্রতিদিনের কাজ। মাঝ রাতেও নাকি আমি বাহারী পিঠা-পুলির গন্ধ পেতাম নাকে! চৈত্র মাসে শীতের ভিজানো পিঠার ঘ্রাণ আসতো! সেমাই আর কুলি পিঠার গন্ধ অহরহ পেতাম! নানা ভাইয়ের নির্দেশ ছিলো, মিয়াভাইকে এখন বানিয়ে দাও! সেই রাতে একটি আইটেম হলেও বানিয়ে দিতেন বলে আন্টি স্মরণ করিয়ে দেন এখনো।

আপা (নানী) আদর করে ডাকতেন মোহব্বত দাদ। অত্র অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাগান বাড়ি নানা ভাইদের। তার বার মাস ফল থাকতো গাছে অর্ধ শতাধিক নারিকেল গাছে সারা বছর ডাব। আমি ডাব নারিকেলের পানি দিয়ে বহুবার গোসলও করেছি। দুধ-কলা খেতে খেতে এক সময় দুধ-কলা দেখলে বমি আসতো। আপা সারাদিন হাস-মুরগীকে আধার খাওয়ানোর মত আমার পিছে পিছে খাবার নিয়ে ঘুরতেন।

আমাদের বাড়িতে ছোট ফুপু আর নানাবাড়ি ছোট খালা। এই দুজনের জন্য আম্মু ঠিকমত কোলে নিতে পারতেন না। তারা আদরে পুষে রাখতে রাখতে আমি বই থেকে আলাদা হয়ে যাই! বিদ্যালয়ে গেলে স্যার পড়া না পারলে পিটাবে এটা তারা মানকে পারবেন না! তাই প্রথম আর দ্বিতীয় শ্রেনি আমার পড়া হয়নি! আব্বু জোর করে তৃতীয় শ্রেনীতে ভর্তি করেছিলেন।

মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য ছোটবেলা থেকে আমার পছন্দ তাই আম্মু আমার জন্য মাঝে মাঝে বাড়িতে মিষ্টি বানাতেন! একবার গরম মিষ্টিতে হাত দিয়ে মুখ ও হাত পুড়ে ফেলি তারপর থেকে আজ অবধি আম্মু আর সেই মিষ্টি বাননি! কারণ জানতে চাইলে আম্মু বলেন, মিষ্টি বানানোর কথা চিন্তা করলে সেদিন তোমার হাত আর মুখ পুড়ে যাবার কথা মনে হয় আর কষ্ট লাগে!

নানা ভাই আমার জন্য তাদের বাজারে দুটো দোকান বলে রেখেছিলেন যা খেতে চাই দেয় যেন সবসময়। মামা আবার সবার অজান্তে একটা দোকানে বলে যেতেন যে মাহমুদুল হাসান যা চায় দিয়েন আমি আগামী মাসে ঢাকা থেকে এসে দিয়ে দিবো।

আজ অবধি পর্যন্ত পুরো কমিউনিটিতে আমার জন্য সাত খুন মাফ। সেই আপনজনদের জন্য একটু পরিশ্রম করে যদি সোস্যাল মিডিয়ায় সিম্প্যাথী চাই এটা হবে চরম বোকামী। এখন আনন্দ একটু কম করলে ক্ষতি কিসের? আনন্দ করার বয়সে তো ছিলাম আনন্দের রাজা। নাম পড়ে যায় বড় বাবু।

এখন যারা পরিবারের ছোট তাদের বাড়তি আনন্দ দিতে আমার নিরন্তর ছুটে চলা। এটা কষ্টের নয় বর্ং আনন্দের। কারণ আমি যে সবার কাছে চীর ঋণী। সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয় কিন্তু ভার কমানোর চেষ্টা করলে এত লাফালাফি কেন বলুন?

এসব ছাড়ুন। পরিবারের ভালোর জন্য আরো বাড়তি কিছু করুন।

লেখক, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী।