২৫শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
head banar ads here

ঈদুল আযহার চেতনায় উজ্জীবিত হোক আমাদের জীবন

শুক্রবার, ০১/০৯/২০১৭ @ ৭:৫৯ অপরাহ্ণ

Spread the love
ঈদুল আযহার চেতনায় উজ্জীবিত হোক আমাদের জীবন

ঈদুল আযহার চেতনায় উজ্জীবিত হোক আমাদের জীবন                                                                                                                        মুহাম্মদ আবদুল জব্বার : আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষ প্রেরণ করেছেন তার ইবাদত-বন্দেগীর জন্য। তিনি আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষকে মর্যাদা দিয়ে খলিফা হিসেবে মনোনীত করেছেন। আল্লাহ তাঁর যাবতীয় আদেশ নিষেধ তাঁর বান্দাদের জন্য রাসূল (সাঃ) ও নবীদের মাধ্যমে নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন গোলামদের বাছাই করতে চান। এ বাছাই প্রক্রিয়ার জন্য তিনি নানাবিধ পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন তাঁর বান্দাদের। যারা এই বাছাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হবেন তিনি তাদেরই উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করবেন। আল্লাহ তায়ালা যেভাবে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও ইসমাঈলকে (আঃ) পরীক্ষা করেছিলেন। মু’মিনরা শত চড়াই-উৎরাই ও কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে আল্লাহর নির্দেশিত পথকেই তাদের জীবনের সম্বল হিসেবে বাছাই করে নেয়; যেমন- নিয়েছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হয়রত ইসমাঈল (আঃ)।

হয়রত ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে নিরালা নির্জনে তার স্ত্রী-সন্তানকে রেখে আসলেন। তাঁর স্ত্রী যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন- কেন আমাদের এই নির্জনে রেখে যাচ্ছেন? ইব্রাহীম (আঃ) আকাশের দিকে তাকালে তাঁর স্ত্রী বিবি হাজেরা বুঝতে পারলেন এটা আল্লাহর নির্দেশ।

হয়রত ইব্রাহীম (আঃ) এমন সাহারা ভূমিতে নির্জনে স্ত্রী-পুত্রকে রেখে যাওয়ার সময় আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন- “হে আমাদের মালিক, আমি আমার কিছু সন্তানকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে একটি অনুর্বর উপত্যকায় এনে আবাদ করলাম, যাতে করে হে আমাদের মালিক এরা নামায প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তুমি (তোমার দয়ায়) এমন ব্যবস্থা কর- যেন মানুষদের অন্তর এদের দিকে অনুরাগী হয়, তুমি ফলমূল দিয়ে তাদের রিযিকের ব্যবস্থা কর, যাতে ওরা তোমার (নেয়ামতের) শোকর আদায় করতে পারে। (সূরা-ইব্রাহীম : ৩৭)।
খাদ্য পানীয় না পেয়ে বিবি হাজেরা সন্তানের জন্য ধূ-ধূ মরু সাহারায় একপাত্র পানির জন্য দিগ্বিদিক ছুটতে লাগলেন। কিন্তু ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসেন সন্তানের কাছে। বিবি হাজেরা এসে দেখলেন সন্তান ইসমাঈলের কচি পদাঘাতে পানির ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে লাগল। এরপর এখানে আবাদ হলো। তখন থেকে আল্লাহ সামর্থ্যবানদের হজ্ব পালন করার নির্দেশ দিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “মানুষের ওপর এ আল্লাহর অধিকার যে, বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাবার শক্তি-সামর্থ্য যে রাখে, সে যেন হজ্ব করে এবং যে এ নির্দেশ অমান্য করে কুফরীর আচরণ করবে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ বিশ্ব প্রকৃতির ওপর অবস্থানকারীদের মুখাপেক্ষী নন”। (সূরা-আলে ইমরান : ৯৭)।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “যখন আমি কাবা গৃহকে মানবজাতির জন্য সম্মিলন ও নিরাপত্তা স্থল করেছিলাম এবং বলেছিলাম, তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানো জায়গাকে নামাযের স্থান বানাও এবং ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম- তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখো”। (সূরা-বাকারা : ১২৫)
হয়রত ইব্রাহীম (আঃ) সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হলেন। তাকে আল্লাহর রাহে সব চেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানী দিতে হবে। অনেক পশু কুরবানী দেয়ার পরও আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হলেন না। পরে তিনি তাঁর সবেচেয়ে প্রিয় সন্তানকে কুরবানী দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বৃদ্ধ বয়সে ইব্রাহীমকে (আঃ) আল্লাহ তায়ালা সন্তান দান করলেন আর সেই কলিজার ধন সন্তানকে নিজহাতে জবেহ করতে হবে! নিঃসন্দেহে এক কঠিন পরীক্ষা। এই কুরবানীর ইচ্ছা সন্তানের কাছে ব্যক্ত করলে সন্তানও আল্লাহর ইচ্ছার কাছে অকপটে নিজেকে সঁপে দেয়ার জন্য তৈরি হলেন।
শয়তান বহুভাবে পিতা-পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশ পালন থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পিতা-পুত্র প্রিয় বস্তুটিকে আল্লাহর রাহে কুরবান করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। তাঁদের এমন নির্ভেজাল আল্লাহর প্রীতিতে খুশি হয়ে আল্লাহ ইব্রাহীম (আঃ) ও ইসমাঈলকে (আঃ) উম্মাহর জন্য এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। হয়রত ইব্রাহীমকে (আঃ) আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর জাতির পিতা হিসেবে মনোনীত করলেন। হয়রত ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে আল্লাহর রাহে কুরবানী দিয়েছিলেন সত্যিই, কিন্তু পরক্ষণে দেখা গেল ইসমাঈল (আঃ) কুরবানী না হয়ে একটি তাজা দুম্বা কুরবানী হয়েছে। আল্লাহু আকবার! এমন যদি না হতো নিঃসন্দেহে পিতা সন্তানকে কুরবানীর রেওয়াজ হয়তো-বা চালু থাকত। সব আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ তায়ালা হয়রত ইব্রাহীম ও ইসমাঈলের (আঃ) ওপর খুশি হয়ে তিনি বান্দাদের জন্য অনুগ্রহ করেছেন, আল্লাহ মানুষকে সন্তান কুরবানী দেয়ার পরিবর্তে পশু জবেহ করার অনুমতি দিলেন। আল্লাহ তায়ালা অমোঘ নিয়ম করে দিলেন কেয়ামত আবধি প্রতিটি সামর্থ্যবান ব্যক্তির যেন তার রাহে কুরবানী দেয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আল্লাহ তায়ালার কাছে কুরবানীর গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না; বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছায় বান্দার তাকওয়াটুকু। বান্দা নিজে কুরবানীর গোশত খাবে এবং অন্যকে তা দেবে। এটাই বান্দার প্রতি তার রবের নির্দেশনা। ‘অতঃপর (জবাই শেষে) তা যখন একদিকে পড়ে যায়, তখন তোমরা তার (গোশত) থেকে নিজেরা খাও, যারা এমনিই (আল্লাহর রিযিকে) সন্তুষ্ট আছে তাদের এবং যারা (তোমার কাছে) সাহায্যপ্রার্থী হয়, এদের সবাইকে খাওয়াও। এভাবেই আমি এদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা (এজন্য) আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করতে পার। আল্লাহ তায়ালার কাছে কখনো কুরবানীর গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না; বরং তার কাছে তোমাদের তাকওয়াটুকুই পৌঁছায়।” [সূরা-হাজ্জ : ৩৬-৩৭]
হাদীস থেকেও এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে- রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম দিন হলো কুরবানীর দিন।” [সুনানে আবু দাউদ]
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, “রাসূল (সাঃ) দশ বছর মদিনায় ছিলেন প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন।” [সুনানে আহমদ]। এ ব্যাপারে আরও একখানা হাদীস প্রণিধানযোগ্য; আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত- রাসূল (সাঃ) বলেন, “কুরবানীর দিবসে কুরবানীর জন্তুর রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আর কোনো আমল আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় নয়। নিশ্চয়ই কুরবানীর জন্তুকে কিয়ামাত দিবসে তার শিং, লোম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। কুরবানীর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তার পক্ষ থেকে কবুল করা হয়।” [ জামিউত তিরমিযি, বাবু মা জাআ ফি ফাযলিল উযহিয়্যা]
আল্লাহর বান্দারা এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে কাজে লাগিয়ে অনন্ত জীবনের সাফল্যের জন্য তৃপ্ত হৃদয়ে স্রষ্টার সৃষ্টির নিমিত্তে কাজ করে যাবেন। তারা মনে-প্রাণে, ধ্যানে-জ্ঞানে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে খুঁজে ফেরে। যেমন- আল্লাহ রাসূলকে (সাঃ) তিনি নির্দেশ করেছেন, “বলো আমার নামায, আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য”। (সূরা-আনআম : ১৬২)।
আল্লাহ মানুষকে অর্থবিত্ত, সহায়-সম্বল দিয়ে অথবা না দিয়ে পরীক্ষা করে থাকেন। তবে তিনি দেখতে চান তাঁর বান্দা তাঁর নির্দেশ পালেনে কতটুকু আন্তরিক। কুরবানী আমাদের সেটাই শেখায়। নিজেকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করার দৃষ্টান্ত নিয়ে পবিত্র ঈদুল আযহা আমাদের মাঝে সমাগত। মুসলিম উম্মাহর কাছে ঈদুল আযহার গুরুত্ব অপরিসীম। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা আমাদের শুধু আনন্দই দেয় না; বরং সব ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও দৃঢ় ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে। ঈদুল আযহা মানুষকে ত্যাগ ও কুরবানীর এমন এক আদর্শে উজ্জীবিত করে, যা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ দূর করে একটি শুদ্ধ-সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য ত্যাগ স্বীকারে অনুপ্রেরণা দেয়। মূলত আমরা যদি ত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই বাস্তব জীবনে ইসলামী আদর্শ অনুসরণ করতে পারি, তাহলেই শুধু ঈদুল আযহার উদ্দেশ্য সার্থক হবে। বিশ্বব্যাপী মিল্লাতে মুসলিমাতের জন্য পরীক্ষা চলছে। জানমাল উৎসর্গের ডাক এসেছে। আমাদের দেশেও সে পরীক্ষা চলছে। এখানেও দ্বীনের জন্য সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটিই আমাদের কুরবানী দিতে হবে। ঈদুল আযহা আমাদের সেই চেতনায় উদ্ভাসিত করে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন! ( সংগৃহীত)

জনমত জরিপ

????? ?? ??????? ???
??
1 Vote
??
0 Vote