২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
head banar

সু চি কি ব্যর্থ প্রেমের জ্বালায় প্রতিশোধ নিচ্ছেন ?

Saturday, 09/09/2017 @ 6:39 pm

সুচি কি ব্যর্থ প্রেমের জ্বালায় প্রতিশোধ নিচ্ছেন ?

সু চি কি ব্যর্থ প্রেমের জ্বালায় প্রতিশোধ নিচ্ছেন ?

আরটিএমনিউজ২৪ডটকম, নিউজ ডেস্কঃ   সময়টা ১৯৬৪ সাল, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। শীতঋতু শুরুর কিছুটা পূর্বাহ্নে শুকিয়ে আসা বিবর্ণ হরিৎ ও হরিদ্রা রঙের পাইন, ম্যাপল, ওক ও অন্যান্য বৃক্ষের পাতাগুলো খসে খসে সব স্তূপ হতে থাকে রাস্তায়।

আর এই রাস্তা ধরে সেইন্ট হিউ কলেজের ছাত্রাবাস থেকে মাউল্টন কোম্পানির একটি সাইকেলে চেপে প্রায় প্রতিদিন যাতায়াত করে সেইন্ট হিউ কলেজে সদ্য ভর্তি হওয়া সু চি নামের মেয়েটি। সু চি ভর্তি হয়েছে দর্শন বিষয়টিতে, আদতে তার ভর্তি হওয়ার ইচ্ছে ছিল ইংরেজি ও ফরেস্টি বিষয়গুলোতে। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আকীর্ণ স্কার্ট, ঊর্ধ্বাঙ্গে একটি জামা ও খোঁপায় একগোছা ফুল গুঁজে মেয়েটি যখন তার লাবণ্য ও দ্যুতি ছড়িয়ে সাইকেলের প্যাডেলটি হালকা চেপে ধীরগতিতে রাস্তা ধরে চলতে থাকে তখন প্রায় প্রতিটি ছেলের মনেই মৃদু দোলা দিয়ে যায়, শুরু হয় ধুকপুকানি। অনেক ছাত্রের হৃদয়েই জাগে সু চি নাম্মি এই মেয়েটিকে প্রেমিকা রূপে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে সু চি পড়াশোনা করেছেন দিল্লির বিখ্যাত লেডি শ্রীরাম কলেজে, রাজনীতি বিষয়ে। ওখানে অবশ্য তাদের জাতীয় পোশাক (সারং) হিসেবে, লুঙ্গি পরেই ক্লাস করা যেত। কিন্তু অক্সফোর্ডে এসে লুঙ্গি নামক এই পোশাকটি পরতে সু চির বেশ লজ্জাবোধ হয়। আর সে জন্যই কিছু দিন তিনি সাদা রঙের একটি জিন্স পরে ক্লাসে যেতেন নিয়মিত। কিন্তু তার কিছু বার্মিজ বন্ধুবান্ধব আড়ালে টিপ্পনি কেটে বলত, “দেখ বিশ্রী বার্মিজ হাঁস সাদা জিন্স গায়ে চাপিয়ে বিলেতি রাজহাঁস সেজেছে। ” এই দুঃখে সু চি জিন্স ছেড়ে স্কার্ট ধরেছেন। অক্সফোর্ডে পড়তে এসে তার সমস্ত জীবনযাত্রাতেই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দিল্লিতে সু চির মা ছিলেন বার্মার রাষ্ট্রদূত। তার মা তাকে সব সময় অতন্দ্র প্রহরীর মতো প্রহরা দিয়ে রাখতেন। পাছে তার মেয়ে আবার কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেম-ট্রেমে জড়িয়ে না পড়ে। কিন্তু অক্সফোর্ডে সে বাধা নেই। এখানে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। মুক্ত বিহঙ্গের স্বাদ নিতে গিয়ে সু চি জীবনে প্রথম প্রেমে জড়ালেন। ছেলেটি এসেছে পাকিস্তান থেকে। নাম তারেক হায়দার। পাকিস্তানি এ ছেলেটি একজন তরুণ কূটনীতিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বৃত্তি নিয়ে সে এসেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে। তারেক হায়দার দেখতে সুদর্শন, সুঠাম ও দীর্ঘদেহী। উপরন্তু সে একজন তরুণ কূটনৈতিক। যেহেতু সু চির মা ছিলেন রাষ্ট্রদূত সেহেতু সু চির ছোটবেলা থেকেই কূটনৈতিক এই পেশাটির প্রতি বেশ মোহ কাজ করত। সু চির জীবনীকার বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক পিটার পপহ্যাম লিখেছেন— “এটি সত্যিই বেশ আশ্চর্যজনক যে সংস্কৃতিগতভাবে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সু চি তারেক হায়দারের সঙ্গে আবিষ্ট হয়েছিলেন গভীর প্রেমে। ” তাদের মধ্যকার গভীর প্রেমের আরও দু-একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি— সু চি যেহেতু বেশ কিছু বছর ভারতের দিল্লিতে কাটিয়েছিলেন সেহেতু তিনি অক্সফোর্ডে এসেও ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেই মেলামেশা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বেধে গেলে, সু চি তারেক হায়দারকে খুশি করতে কোনো ভারতীয় ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে উঠা-বসা তো দূরের কথা তাদের সঙ্গে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। অক্সফোর্ডে যে সব ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করে তাদের বেশির ভাগই সাধারণত প্রথম বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু সু চি তারেকের সঙ্গে প্রেমে এতটাই মত্ত ছিলেন যে, তার লেখাপড়া করার সময় ছিল না, আর সে জন্যই সু চি শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিভাগ পেয়ে কোনো রকমে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। অক্সফোর্ডে লেখাপড়ার পাঠ শেষ হলে তারেক হায়দার পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সু চির সঙ্গে সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাদের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় ভীষণভাবে মুষড়ে পড়েন সু চি। অশ্রুবিসর্জনের মধ্য দিয়ে কাটে বেশ কয়েক মাস। সু চির জীবনীকার পপহ্যাম লিখেছেন— সু চি প্রায় বছরখানেক সময় বিরহে কাটিয়ে ছিলেন তারেক হায়দারের জন্য, সে সময় তিনি ছিলেন শোকে মুহ্যমান ও বিধ্বস্ত। তার এই শোকগ্রস্ত অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ইংল্যান্ডে সু চির পরিবারের পুরনো বন্ধু স্যার পল গর বুথ ও মিসেস বুথের পুত্র ক্রিস্টোফার সু চির প্রয়াত স্বামী মাইকেল আরিসের সঙ্গে সু চির পরিচয় করিয়ে দেন এবং পরবর্তীতে বছর তিন-চারেক পরে ১৯৭২ সালে তারা দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বর্তমানে রাখাইন প্রদেশে হাজার হাজার বিপন্ন মানুষ ও জনপদ দেখে আমার কেন যেন মনে হয় সু চি কি তাহলে আজ তার বহুকাল আগের ব্যর্থ প্রেমের প্রতিশোধ নিচ্ছেন। হলে হতেও পারে। এমনটি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিচিত্রময় এই পৃথিবীতে অনেক কিছুই সম্ভব। এ ছাড়া সু চির অন্যতম নির্ভরযোগ্য জীবনীকার পিটার পপহ্যাম ‘দ্য লেডি অ্যান্ড পিক্ক’-এ লিখেছেন সু চির ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুই না কি জটিলতায় পূর্ণ ও বৈপরীত্যে ভরা। সু চির আরেকটি বিশেষ দিক হলো শান্তিতে নোবেল পেয়ে কীভাবে তিনি হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মতো বিষয়গুলোতে নীরবে ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছেন। একজন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের কি এসব দেখে চুপ থাকা সম্ভব। ধর্মের কথা না হয় আমি বাদই দিলাম। কিন্তু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন তো মানুষ। না কি তারা জীবজন্তু? বনের পশুদেরও মানুষ এভাবে হত্যা করে না কিংবা করে না লুণ্ঠন ও ধর্ষণ। শান্তিতে নোবেল পাওয়া তথাকথিত এই শান্তির প্রতিভূ না কি আবার গান্ধী ভক্ত। বিষয়টি সত্যিই বেশ হাসির খোরাক জোগায়। ১৯৮৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি কমবেশি প্রায় পনের থেকে একুশ বছর গৃহবন্দী ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমাদের জানিয়েছেন এই পুরোটা সময় তিনি না কি বই পড়ে কাটিয়েছেন। কী ধরনের বই যে তিনি পড়েছেন সে প্রশ্ন আসতেই পারে সামনে। তবে সেখানে যে কোনো মানবতার বই ছিল না সে বিষয়ে আমি শতভাগ নিশ্চিত। সু চি তার সাক্ষাৎকারে আরও বলেছেন, তার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী। আজ ভাবতেই অবাক লাগে তিনি যখন তার বাসভবনে গৃহবন্দী ছিলেন তখন তার বাসভবন ঘেঁষে ছিল সামরিক জান্তা প্রদত্ত নিরাপত্তা চৌকি। রাতের অন্ধকারে সু চি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস দর্শনের অনেক বাণী লিখে সেগুলো সেঁটে দিয়ে আসতেন সেই নিরাপত্তা কর্মীদের ঘরের দেয়ালে। কথাবার্তায়, আচার-আচরণে, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি গান্ধীজীর অহিংসার কথা বলতেন; বৌদ্ধধর্মের শান্তির কথা বলতেন, গণতন্ত্রের কথা বলতেন, মুক্তির কথা বলতেন। সু চি সামরিক নিরাপত্তা কর্মীদের প্রশ্ন করতেন “তোমরা কি কখনো রাজনীতি নিয়ে ভাবো কিংবা রাজনীতি নিয়ে চিন্তা কর?” নিরাপত্তা কর্মীরা মাথা নেড়ে না-সূচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন। তখন সু চি বলতেন আমার বাবা অং সান বলতেন, “You may not think about politics but politics thinks about you”. অর্থাৎ তুমি হয়তো রাজনীতি নিয়ে ভাবো না রাজনীতি কিন্তু ঠিকই তোমাকে নিয়ে ভাবে। অথচ আজ এত বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রাখাইন প্রদেশের হাজার হাজার মুসলিম জনগণ অসহায় কিন্তু তাদের পাশে নেই, সেই গান্ধীভক্ত শান্তির প্রতিভূ অং সান কন্যা অং সান সু চি।

এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে যে, আজ যদি মহাত্মা গান্ধী বেঁচে থাকতেন তবে সু চির এই সাক্ষাৎকারটি পড়ে হৃদযন্ত্রের ক্রীড়া বন্ধ হয়ে মারা যেতেন নিশ্চয়ই। বিশিষ্ট গান্ধী ভক্তের মগজ আজ সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন। এ যেন কল্পনা করাও কষ্ট। রাখাইন প্রদেশে জাতিগত এই দাঙ্গা যে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা উঠে এসেছে কয়েক সপ্তাহ আগে নিউইয়র্ক টাইমস থেকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে। সেখানে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, ২২ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে কমপক্ষে ৮৩০টি বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে ২৫ হাজার বাড়িঘর, দোকানপাট, ১২টি মসজিদ এবং ৩০টিরও বেশি স্কুল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১০ বছরে পাঁচ হাজারেরও অধিক গ্রাম ধ্বংস হয়েছে এই জাতিগত দাঙ্গায় এবং এর ফলে পাঁচ লক্ষাধিক উদ্বাস্তু বর্তমানে অবস্থান করছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সুত্রঃ ডিকেটাইমস২৪

এই পাতার আরো সংবাদ
bg1
bg1
top-banner
bg1