১১ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
head banar ads here

সরকারি ভবন দখলে ব্যর্থ মিঃ এফ রহমান

বৃহস্পতিবার, ৩০/১১/২০১৭ @ ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

সরকারি ভবন দখলে ব্যর্থ মিঃ এফ রহমান

নিউজ ডেস্কঃ সরকারের চারটি বাড়ি দখলে নেওয়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে। বাড়িগুলো দখল করতে এক পাকিস্তানি নাগরিককে বাংলাদেশে এনে সেগুলোর মালিক সাজানো হয়েছিল। বাংলাদেশে তাঁর নাগরিক হিসেবে জন্মসনদ ও পাসপোর্ট তৈরি হয় অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে।

ধন্যবাদ দেশের জনপ্রিয় দৈনিক প্রথম আলোকে, তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেড়িয়ে এসেছে সরকারি বাড়ি দখলের সব তথ্য।

গতকাল প্রকাশিত প্রথম আলোর ঐ প্রতিবেদন সুত্রে জানা যায়, ওয়াকার আহমেদ নামের পাকিস্তানি ওই নাগরিককে এই সব কাজে সহযোগিতা করেন বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান।

যে চারটি বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হয়, সেগুলোর একটি ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কের ‘সাদা বাহার’ নামের ১০৪ নম্বর বাড়ি; এটি বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (এনএসআই) প্রশিক্ষণ ভবন। একটি মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার ১৪০ নম্বর বাড়ি, মতিঝিল পুলিশের থানা ভবন। অন্য দুটি হলো মতিঝিলের ১০ নম্বর বাড়ি ও দিলকুশার ৬৪ নম্বর বাড়ি। এ দুটি বাড়ি যথাক্রমে বাংলাদেশ টাইপরাইটারের মালিক মাহবুবুর রহমান ও প্রয়াত মন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়াসহ পাঁচজনের নামে দীর্ঘ মেয়াদে লিজ দেওয়া। এই দুই বাড়িতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব বাড়ি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন।

যে বাড়িগুলো দখল করার অপচেষ্টা হয়েছিল, সেগুলোর মালিকানা সরকারের হাতেই থাকছে। বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এইচ মো. নূরুল হুদা জায়গীরদারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১৩ এপ্রিল এ-সংক্রান্ত রায় দিয়েছিলেন।

সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সুকুমার বিশ্বাস এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এই চারটি বাড়ির মালিকানা দাবি করে আদালতে যেসব কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছিল, তার সবই জাল। রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এসব সম্পদের কোনো দাবিদার নেই, সবই পরিত্যক্ত সম্পত্তি। এগুলো আগে থেকেই রাষ্ট্রের দখলে ছিল, এখনো এ চার ভবনের মালিক রাষ্ট্রই।

জাল কাগজপত্র দিয়ে সরকারি সম্পদ দখলের চেষ্টা নিয়ে আদালতের রায়ের ব্যাপারে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর নির্ধারিত জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি তাঁর যে বক্তব্য দেয়, তাতে বলা হয়, বেআইনিভাবে বাড়ি দখল এবং জাল কাগজপত্র বানানোর প্রশ্নই ওঠে না। সম্পূর্ণ বৈধভাবেই আমমোক্তারনামা নেওয়া হয়েছে। এসব বাড়ির দাবিদার ওয়াকার আহমেদের ছেলে গুলজার আহমেদ ঢাকার নটর ডেম কলেজে সালমান এফ রহমানের সহপাঠী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সম্প্রতি লন্ডনে দেখা হওয়ার পর তিনি সহায়তা চান। আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁকে সহায়তা করতেই সালমান রহমান এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে তাঁর জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে দাবি করা হয়।

যেভাবে দখলের প্রক্রিয়া শুরু

স্বাধীনতার আগে জিএম মাদানি ডিআইটির (বর্তমানে রাজউক) চেয়ারম্যান থাকার সময় বহু পাকিস্তানি নাগরিককে সে সময়ের মূল্যে ঢাকা শহরের জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। আলোচিত এই চারটি বাড়ির জমিও ১৯৬০-৬৩ সময়ের মধ্যে তিনি ওয়াকার আহমেদ নামের এক ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ওয়াকারের পরিবার পাকিস্তানে স্থায়ী হয়। ১৯৭২ সালে এই চারটি বাড়ির দাবিদার না থাকায় ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৮৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এই মর্মে গেজেট হয়।

গেজেট প্রকাশের পর ওয়াজিউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি আগের মালিক ওয়াকার আহমেদের সই জাল করে একটি আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) তৈরি করেন। সেই আমমোক্তারনামা দিয়ে তিনি সরকারি গেজেটকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৮৬ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকার দেওয়ানি আদালতে একটি মামলা করেন। দেওয়ানি মামলা চলার সময় তিনি এ-সংক্রান্ত তথ্য গোপন করে এসব বাড়ি ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’র তালিকাভুক্ত নয় দাবি করে কোর্ট অব সেটেলমেন্টে (ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি আদালত) চারটি মামলা করেন। এই মামলার নথিতেও ওয়াকার আহমেদের সই জাল করেন।

কোর্ট অব সেটেলমেন্ট ১৯৯২ সালের ১৪ অক্টোবর এই বাড়িগুলো পরিত্যক্ত সম্পত্তি নয় বলে রায় দেন। তবে সেটেলমেন্ট কোর্টের রায় পক্ষে গেলেও ওয়াজিউদ্দিন বাড়িগুলোর দখল নিতে পারেননি।

এর আগে ওয়াকার আহমেদের ছেলে পরিচয় দিয়ে ফিরোজ আহমেদ নামের এক ব্যক্তি ঢাকার বড় কাটরার (১২ ও ১৩ নম্বর হোল্ডিং) একটি সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে মামলা করে হেরে গিয়ে রিট আবেদন করেন। ফিরোজ আহমেদ রিটে নিজেকে ওয়াকার আহমেদের একমাত্র ছেলে এবং তাঁর বাবা চিকিৎসার জন্য ইউরোপ গেছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু ফিরোজ আহমেদ বা তাঁর বাবা ওয়াকার আহমেদ তখনো পাকিস্তানেই অবস্থান করছিলেন। ওয়াজিউদ্দিন এসব জাল কাগজপত্র তৈরি করেছিলেন।

২০০৭ সালের ১২ জুলাই ধানমন্ডি থানার পুলিশ ওয়াজিউদ্দিনকে জমি জালিয়াত চক্রের নেতা হিসেবে গ্রেপ্তার করেছিল। তিনি পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে জমি দখল ও মামলা করার কথা স্বীকার করেন। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর মুক্তি পেয়ে ২০১০ সালে তিনি মারা যান। ওয়াজিউদ্দিনের পরিবার এখন থাকে ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে। তাঁর ছেলে একাব্বর হোসেন টাঙ্গাইল-৭ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই সব জমি নিয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই, তিনি কিছু জানেন না।

শুরু নতুন অধ্যায়

এদিকে এই চারটি বাড়ি সরকারের দখলে থাকলেও তখন পর্যন্ত সেটেলমেন্ট কোর্টের রায় ওয়াজিউদ্দিনের পক্ষেই বহাল ছিল। ফলে বাড়িগুলো পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকার বাইরে থেকে যায়। এ সুযোগটিই নেয় প্রভাবশালী মহলটি। তারা পাকিস্তানে বসবাসকারী ওয়াকার আহমেদকে ঢাকায় আনার বন্দোবস্ত করেন।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ওয়াকার আহমেদকে ভিসা দেওয়ার জন্য বেক্সিমকো গ্রুপের প্যাডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান। ২০১৫ সালের ৮ মার্চ পাঠানো তাঁর এই চিঠির ওপর ভিত্তি করে ওয়াকারকে ভিসা দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করাচির হাইকমিশনে সুপারিশ পাঠায়। ওয়াকার আহমেদ ১৩ এপ্রিল পিকে-২৬৬ ফ্লাইটে করে করাচি থেকে পাঁচ দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন। বিমান থেকে নামার পর ওই দিনই তিনি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর অঞ্চল থেকে বাংলাদেশি হিসেবে জন্মনিবন্ধন সনদ নেন। অথচ বাংলাদেশের ভিসা নেওয়ার সময় তিনি নিজেকে পাকিস্তানের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দেন।

রায়ে আরও বলা হয়, ওয়াকার আহমেদ বাংলাদেশে আসার দুই দিন পর ১৫ এপ্রিল ঢাকা থেকে যন্ত্রে শনাক্ত করা যায় বা এমআরপি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। তবে তিনি নিজে পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হননি। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আবেদন করেন এবং বাসায় এসে তাঁর আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। ওই দিনই তাঁর নামে এমআরপি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।

ধানমন্ডি ১০৪ নম্বর বাড়ি :‘সাদা বাহার’ নামের বাড়িটি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (এনএসআই) প্রশিক্ষণ ভবন
বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাসুদ রেজওয়ান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ওয়াকার আহমেদের নামে ২০০৭ সালে একটি হাতে লেখা পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। তার বিপরীতেই এমআরপি দেওয়া হয়েছে। তিনি পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে কীভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেলেন জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ওয়াকার আহমেদ স্বাধীনতার পরে কখনো বাংলাদেশে আসেননি। তারপরেও ২০০৭ সালে তাঁর নামে হাতে লেখা পাসপোর্ট কে দিয়েছিল বা কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, সেই উত্তর দিতে পারেনি বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এ নিয়েও তদন্ত করছে অধিদপ্তর।

ওয়াকার আহমেদ পাসপোর্টে নিজের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে আজিমপুরের একটি বাড়ির নম্বর দেন। ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির মালিক হাজি আবু ইউনুসের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন। বাড়ির একজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ওয়াকার নামের কেউ কখনো এই বাড়িতে ছিলেন না। ওয়াকার আহমেদ পাসপোর্টে নিজের যে ফোন নম্বরটি দিয়েছেন, সেটা ব্যবহার করছেন বেক্সিকো গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার তাসনিন হোসেন। ওই নম্বরে ফোন করলে তাসনিন বলেন, ‘ওয়াকার আহমেদ আমার বসের বন্ধু। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’ পাসপোর্টে জরুরি ঠিকানা হিসেবে ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটের নম্বর দেওয়া আছে। গতকাল সেখানে গেলে ভবনটির অন্য বাসিন্দারা বলেন, তাঁরা ফ্ল্যাটটি বেক্সিমকো গ্রুপের ফ্ল্যাট বলে জানেন। তবে কাগজপত্রে এর মালিক জুপিটার বিজনেস লিমিটেড। জুপিটারের মালিক মুশফিকুর রহমান। দেড় বছর ধরে এটি তালাবদ্ধ।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ওয়াকার আহমেদ পাসপোর্ট হাতে পেয়েই আমমোক্তারনামা করার জন্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করেন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করে তাঁর সম্পত্তি ছাড় করার আবেদন জানান। কিন্তু এভাবে আমমোক্তারনামা বিধিমোতাবেক নয় বলে সাব-রেজিস্ট্রার সেটা রেজিস্ট্রি না করে মহাপরিদর্শক নিবন্ধকের কাছে পাঠিয়ে দেন। ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল আইনসচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর পক্ষে মতামত দেন। এরপর তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার আকবর আলী আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) রেজিস্ট্রি করেন। ১৭ এপ্রিল ওয়াকার করাচি চলে যান।

রায়ে দেখা যায়, ওয়াকার আহমেদ তাঁর সম্পত্তির আমমোক্তার নিযুক্ত করেছিলেন ধানমন্ডির আইভি রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমানকে। নথিপত্রে দেওয়া আইভি রিয়েল এস্টেটের ঠিকানা অনুযায়ী ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কে গিয়ে জানা যায়, যে বাড়ির নম্বর দেওয়া আছে, সেটা বেক্সিমকোর কার্যালয় ‘বেল টাওয়ার’। মুশফিকুর রহমানের খোঁজ করলে একজন কর্মকর্তা বলেন, মুশফিক বেক্সিমকো গ্রুপের কর্মকর্তা ছিলেন, দুই বছর আগে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

এরপরেই সরকারের রিট

আমমোক্তারনামা রেজিস্ট্রির পরেই টনক নড়ে সরকারের। সরকার ২০১৫ সালের ৪ মে এ নিয়ে একটি রিট করে।

তবে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সুকুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে জানান, সেটেলমেন্ট কোর্ট ১৯৯২ সালের ১৪ অক্টোবর যে রায় দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধেই ২৩ বছর পর রিটটি করা হয়।

রিটের আরজিতে বলা হয়, সেটেলমেন্ট কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা জাল দলিলের ওপর ভিত্তি করে। কারণ, ওয়াকার আহমেদ বাংলাদেশি পাসপোর্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আইন শাখায় জমা দেন ২০১৫ সালের ১৮ জুন। অথচ বাংলাদেশে ভ্রমণের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয় একই বছরের ৮ মার্চ। সে সময় তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্টে এ দেশে আসেন। ভিসা নেওয়ার সময় তিনি যে তথ্য দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, ১৯৫২ সাল থেকে তিনি পাকিস্তানে বসবাস করছেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রিট আবেদনকারীদের পক্ষে বলেন, সেটেলমেন্ট কোর্ট রায় ও আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক মনোবৃত্তি প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন।

আদালত রায়ে বলেন, সেটেলমেন্ট কোর্ট তাঁর এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে রায় ও আদেশ দিয়েছেন। এই রায় বা আদেশের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। ফলে ভবনগুলো পরিত্যক্ত সম্পক্তি হিসেবেই বিবেচিত থাকবে।

তবে বিবাদীদের পক্ষে আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, সেটেলমেন্ট কোর্ট ‘ইনোসেন্ট’ রায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, গেজেট প্রকাশের আগেই ‘ক’ (পরিত্যক্ত সম্পত্তি) তালিকা থেকে সম্পত্তিগুলো বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল।

জাল কাগজপত্র দিয়ে সরকারি সম্পদ দখলের ব্যাপারে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ করা হবে কি না—জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা তো আর আমার ব্যাপার নয়। তবে এটা সত্য যে যারা এর মালিকানা দাবি করেছিল, তারা হেরে গেছে।’

সালমান এফ রহমান যা বললেন

প্রথম আলোকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে সালমান এফ রহমান বলেন, ওয়াকার আহমেদের কাগজপত্রকে হাইকোর্টের রায়ে কোথাও জাল বলা হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল সম্পূরক হলফনামার মাধ্যমে এসব কাগজপত্র রিট মামলায় দাখিল করেছেন। তিনি এটা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে ওয়াকার আহমেদ পাকিস্তানি নাগরিক। কিন্তু তিনিও তাঁর বক্তব্যে কোথাও এগুলোকে জাল বলেননি।

সালমান এফ রহমান আরও বলেন, ওয়াকার আহমেদ এসব বাড়ির মালিক ছিলেন। এসব প্লট পরিত্যক্ত ঘোষণার আগেই ওয়াকার একটি দেওয়ানি মামলা করেন। তাঁর পক্ষে আদালত রায় দেন। এই মামলা চলার সময় তিনি সেটেলমেন্ট আদালতে আবেদন করেন। সেটেলমেন্ট আদালতও তাঁর পক্ষে রায় দেন। শুধু এই রায়ের বিরুদ্ধে ২৩ বছর পর রিট মামলা দায়ের হয়, যার রায় ঘোষণা করা হয় গত ১৩ এপ্রিল। তিনি বলেন, দেওয়ানি মামলার বিরুদ্ধে সরকার হাইকোর্টে আপিল করলে তা খারিজ হয়ে যায়। ফলে মালিকানার বিষয়ে আপিল বিভাগের রায় এখনো ওয়াকারের পক্ষে বহাল আছে। আইভি রিয়েল এস্টেট আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে বৈধভাবে মামলা পরিচালনা করাসহ অন্যান্য কাজের জন্য ওয়াকার আহমেদের কাছ থেকে বৈধভাবে আমমোক্তারনামা দলিল সম্পাদন করেছে।

তবে ওই পাকিস্তানিকে বাংলাদেশে আনার পর রাতারাতি তাঁর পাসপোর্ট তৈরি, বাংলাদেশি জন্মসনদ জোগাড়, বেক্সিমকোর ঠিকানা ব্যবহার—এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান কোনো মন্তব্য করেননি। বরং মামলা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভিসার জন্য চিঠি দেওয়াসহ পরবর্তী প্রতিটি পদক্ষেপেই বেক্সিমকো গ্রুপর সংশ্লিষ্টতাই পাওয়া গেছে। সালমান এফ রহমান নিজেই চিঠি দিয়েছেন। দ্রুতগতিতে জন্মসনদ, পাসপোর্ট নেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক সচিবের সঙ্গেও ওয়াকার আহমেদ দ্রুত দেখা করতে পেরেছেন। এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেক্সিমকো গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

সর্বশেষ অবস্থা

ভবন চারটি এখনো সরকারের দখলে রয়েছে। আদালতের রায় অনুযায়ী, বাড়িগুলো পরিত্যক্ত সম্পত্তি। এগুলো স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রের দখলে ছিল। এখনো ভবন চারটির মালিক রাষ্ট্র।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, প্রভাবশালীদের অনেকেই প্রতারণা করে সম্পদের মালিক হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে অনেকেই সফল হন। অনেক সময় তাঁরা আইনের ঊর্ধ্বে থেকেও যা খুশি করেন। তবে আলোচিত চারটি বাড়ি হয়তো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি সতর্ক হন, তাহলে সরকারি সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।