, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০

Avatar admin

সাদা পোষাকে গ্রেপ্তার বন্ধ হওয়া প্রয়োজন

প্রকাশ: ২০১৮-০১-২৫ ১৯:১০:১২ || আপডেট: ২০১৮-০১-২৫ ১৯:১০:১২

Spread the love

সাদা পোষাকে গ্রেপ্তার বন্ধ হওয়া প্রয়োজন
মন্তব্য প্রতিবেদন,(ফাইল ছবি) আরটিএমনিউজ২৪ডটকমঃ সারা দেশে গুম, হত্যা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মতো ঘটনা একের পর এক চলছেই। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে দায়ী করছেন দেশের সচেতন জনগণ। সর্বশেষ এই বাহিনীর গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

ইউনিফর্ম না পরে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তারের ঘটনা ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন আপিল বিভাগ। এর আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃক গুম, হত্যা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতন নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেছিলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিয়ন্ত্রণহীন পুলিশের এখন লাগাম টেনে ধরা দরকার; অত্যাচারী পুলিশ আমাদের প্রয়োজন নেই।

এদিকে দেশে গুম, হত্যা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতর হচ্ছে। বর্তমান মহাজোট সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও তাদের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটেছে বেশী যাহা উদ্বেগজনক।

এদিকে কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় থাকতে হবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

ইউনিফর্ম না পরে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তারের ঘটনা ভয়াবহ, বলেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার (৫৪ ধারা) ও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ধারা (১৬৭ ধারা) সংশোধনে এক যুগ আগে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিতে এসব মন্তব্য করেছিলেন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি ।

সাদা পোষাকে আসামী ধরতে গিয়ে বার বার লংকাকান্ড ঘটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায় । অনুরূপ ঘটনা ঘটে গেল চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের ভাটিয়ারীতে ।

গতকাল বুধবার (২৪ জানুয়ারী) দিবাগত রাতে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে পুলিশের গুলিতে সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন; এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরো দুই জন। নিহত সাইফুল ইসলাম (২২) ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তেলিপাড়ার শামশুল আলমের ছেলে। গুলিবিদ্ধ অপর দু’জন হলেন- একই এলাকার বাসিন্দা ইমরান আলী জয় (১৮) ও কবির আহমেদ ওরফে ভোলা ড্রাইভার (৫৫)।

বুধবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় সীতাকুণ্ড মডেল থানা পুলিশের একটি টিম মাইক্রোবাস নিয়ে সাদা পোশাকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকায় গিয়ে কয়েক ব্যক্তিকে তাস খেলতে দেখে টেনে তাদের গাড়িতে তুললে এলাকাবাসী বাধা দেয়। এক পর্যায় পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে তিনজন গুলিবিদ্ধ হলে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন ভাঙচুর করে। এদিকে গুলিবিদ্ধ তিনজনকে হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে সাইফুল ইসলাম মারা যান।

২০১৬ সালেও একই ঘটনার জম্মে দিয়েছিল সীতাকুন্ড থানা পুলিশ । সেই দিনের ঘটনার ক্ষোভ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে সীতাকুন্ডের ভুক্তভোগিরা ।

এসকল অভিযানকে ঘিরে নানা প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। এছাড়া বাড়ছে সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের বিরোধ। সেই ঘটনার মামলায় আসামী করা হয়েছিল সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক এবং স্থানীয় মাদক প্রতিরোধ কমিটির নেতা শাওন চৌধুরী, তার সহোদর শাহেদ চৌধুরীসহ সাত ছাত্রলীগ নেতাকে।

সাধারন মানুষেরা আবারো প্রশ্ন তুলেছে, সাদা পোষাকে আসামী ধরা কি বন্ধ হবেনা, নাকি পুলিশ আসামী ধরার নামে বাণিজ্য করতেই প্রতিবার এমন ঘটনার জন্ম দিচ্ছে ?

অথচ, সর্বোচ্চ আদালতের রায় বার বার লংগিত হচ্ছে পুলিশের এমন ভুমিকায়, ২০১৬ সালে এই সংক্রান্ত ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছিল উচ্চ আদালত ।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করার যে ক্ষমতা পুলিশের ছিল তা বাতিল করে ২০১৬ সালে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন উচ্চ আদালত।এ বিষয়টি ঘিরে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারের অসংখ্য নজির রয়েছে।

আপিল বিভাগ সাফ জানিয়ে দি্যেছিলেন, আটকাদেশ দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে না। এ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। আর আটকের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে।

পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ—সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশনা দিয়ে প্রায় ১৩ বছর আগে হাইকোর্ট এই রায় দিয়েছিলেন। ১৫ দফা নির্দেশনা সংবলিত ওই রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।

হাইকোর্টের রায়ে দেয়া নির্দেশনাঃ

ক. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে না। খ. কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ. গ্রেপ্তারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে। ঘ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তির নিকট আত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিষয়টি জানাতে হবে। ঙ. গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে তার পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী ও আত্মীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। চ. গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে কারাগারের ভেতরে কাচের তৈরি বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ওই কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকট আত্মীয় থাকতে পারবেন। ছ. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। ট. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিকেল বোর্ড গঠন করবে। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নেবেন এবং তাকে দ-বিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে। এসব নির্দেশনা ছয় মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল হাই কোর্টের সেই রায়ে।

এদিকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে চাঁদার টাকা না দেয়ায় পুলিশের আগুনে দগ্ধ চা দোকানি বাবুল মাতুব্বরের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। পুলিশের বাড়াবাড়ি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে অভিযোগ করে তিনি বলেছেন, নিয়ন্ত্রণহীন পুলিশের এখন লাগাম টেনে ধরা দরকার; অত্যাচারী পুলিশ আমাদের প্রয়োজন নেই।

এদিকে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর রেকর্ড অনুযায়ী সোয়া ৩ বছরে ৪০৩ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ২০০৯ সালে ১৫৪, ২০১০ সালে ১২৭ ও ২০১১ সালে ৪৮ জন। ২০১২ সালে ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার ৩৮ জনের মধ্যে ৩৩ জন কথিত ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে র‌্যাবের হাতেই ২৪ জন, পুলিশ কর্তৃক ৩ জন, র‌্যাব-পুলিশ যৌথভাবে ২ জন ও র‌্যাব-কোস্টগার্ড কর্তৃক ৪ জন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঐ রায়ের প্রক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ব্লেছিলেন, দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশকে তাদের নির্ধারিত পোশাক পরতে হবে। এখন থেকে সাদা পোশাকে পুলিশ ডিউটি করতে পারবে না। গোয়েন্দা পুলিশ যদি সাধারণ পোশাকে দায়িত্ব পালন করেন তবে তাকে অবশ্যই গোয়েন্দা পুলিশের ট্যাগ মার্ক লাগানো কটি পরতে হবে। কটি না পরলে তিনি দায়িত্বরত বলে বিবেচিত হবেন না। শিগগিরই এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হবে।

আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক বলেছিলেন, পুলিশের অনেক সফলতা রয়েছে। ব্যক্তির দায় বাহিনী নেবে না। সাদা পোষাকে পুলিশ অভিযান চালাতে পারবে না এ ব্যাপারে সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া আছে।

তবে সাধারন জনগণের দাবি দ্রুত বন্ধ হউক পুলিশের এহেন কর্মকান্ড । সেতুবদ্ধন রচনা হউক জনগণ ও পুলিশের মাঝে, আইন সমান হউক সবার জন্য ।

Logo-orginal