২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং, ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
ads here

মাহে রমজানের প্রস্তুতি: মাহফুজা সুলতানা উম্মেহানী

বৃহস্পতিবার, ১০/০৫/২০১৮ @ ৩:৩৮ অপরাহ্ণ

Spread the love

॥ মাহফুজা সুলতানা উম্মেহানী॥
আরবি মাসের নবম মাস ‘রমজান’ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। বাড়িতে কোনো মেহমান আসার দিন ঠিক হলে আমরা পূর্ব থেকেই নানা প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। বাড়ির কাপড়, বিছানাপত্র অগোছালো থাকলে দ্রুত পরিপাটি করি। বাড়ির আশ-পাশের ময়লা-আবর্জনা রয়ে গেল কিনা তা দেখে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করি। মেহমান যিনি বা যারা আসবেন তাদের আপ্যায়নে যাতে কোনো প্রকার অসন্তুষ্টি বা অসম্মান না হয় সে ব্যাপারেও বেশ তৎপর থাকি। 

তেমনিভাবে রমজান আমাদের মুসলিম সমাজে এক বিশেষ অতিথি। এ মাস এমন এক অতিথি যার আগমনে আসমান-জমিনে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন রমাদানের প্রথম রাত্রি আগমন করে শয়তান এবং অবাধ্য জিনদের শৃঙ্খলিত করা হয়, জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়; খোলা রাখা হয় না কোনো দ্বার। জান্নাতের দুয়ারগুলো অর্গলমুক্ত করে দেয়া হয়; বন্ধ রাখা হয় না কোনো তোরণ। এদিকে একজন ঘোষক ঘোষণা করেন, হে পূণ্যের অনুগামী, অগ্রসর হয়। হে মন্দ পথযাত্রী থেমে যাও। আবার অনেক ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আর এমনটি করা হয় রমাদানের প্রতি রাতেই।” [তিরমিজি  : ৬৮২; ইবনে মাজা : ৩৪৩৫ সহীহুত তিরমিজি তে শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]

সুতরাং বরকতময় রমাজান মাস আমাদের মাঝে বছর পরিক্রমায় আবার সমাগত। হিজরী অষ্টম মাস শাবান মাসকে আমরা রমাদানের  পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করবো। আমাদের সমাজের দুনিয়াবী কাজের ব্যস্ততায় মুসলিম মা-বোনেরা যেন রমাজানের বরকতময় মুহূর্তগুলো যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে নিজের আমল উন্নত করতে পারে; সেজন্য পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক কিছু করণীয় কাজ নিন্মে তুলে ধরা হল :

১.পরিকল্পনা করা

রমাজানের কোনো কাজই সাফল্যমণ্ডিত হতে পারে না। যে কোনো ভালো কাজে সুফল পেতে হলে প্রথমে পরিকল্পনা করে নিতে হবে। রমাদানের কাজগুলো ও তার পূর্বের কাজগুলো আমরা পর্যায়ক্রমে নোট করে নেব। কোনোদিন, কোনো কাজ করবো সে ব্যাপারে একটা নোট খাতা থাকা জরুরি।

২. অধিক গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা

রমাজানের প্রাথমিক করণীয় কাজগুলো হালকা করে না দেখে অধিক গুরুত্বের সাথে বিষয়টি গ্রহণ করা। এ মাস আসার আগেই এর যথার্থ মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এ মাস যেন আমাদের বিপক্ষে দলিল না হয়ে দাঁড়ায় সেজন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। কারণ মাসটি পেয়েও যে উপযুক্ত মূল্য দিল না, বেশি বেশি পুণ্য আহরণ করতে পারল না এবং জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের পরোয়ানা পেল না, সে বড় হতভাগ্য।

৩. রমাজান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানার্জন

রমাজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত, কাদের ওপর ফরজ, সিয়াম ভঙ্গের কারণ, কখন সিয়াম ভাঙতে পারবে, জাকাত, কাফফারা, ইতিকাফ, শবে ক্বদর, কিয়ামুল লাইল ইত্যাদি বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। রমাদান বিষয়ে অনেক বই-পুস্তক হাদীসগ্রন্থ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ইন্টারনেটের মাধ্যমেও আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি।

৪. শাবান মাসে অধিকহারে সিয়াম পালন করা

হিজরি বর্ষপরিক্রমায় চান্দ্র মাসের অষ্টম মাস পবিত্র শাবান মাস। এটি একটি ফজিলতপূর্ণ মাস। রমাদানের আগমনী বার্তাবাহক এ মাস। শাবান মাস মূলত: পবিত্র রমাদান মাসের প্রস্তুতির মাস। শাবান মাসের দিন তারিখ গননা করা। বিভিন্ন হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজব ও শাবানে রমাদানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। উম্মে সালমা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শাবান ও রমাদান ব্যতীত দুই মাস একাধারে সিয়াম পালন করতে দেখিনি। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শাবান মাসের মত এত অধিক (নফল) সিয়াম পালন করতে দেখিনি। এ মাসের অল্প কিছুদিন ব্যতীত সারা মাসটাই তিনি নফল সিয়াম পালন করতেন। [জামে তিরমিজি  : ১/১৫৫]

৫. আল্লাহভীতি অর্জন ও তাওবার প্রস্তুতি গ্রহণ

মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তোমাদের ওপর রমাদানের সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যাতে তোমরা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পার।” [সূরা বাকারা : ১৮৩]

বিগত এগার মাসের গুনাহ মুক্তির জন্য তাওবার প্রস্তুতি গ্রহণ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা এবং ক্ষমা প্রার্থনা কর, আর আমি দিনে একশতবারের বেশি তাওবা করে থাকি। [সহীহ মুসলিম : ৭০৩৪]

৬. কুরআন সংক্রান্ত প্রস্তুতি

পবিত্র কুরআনকে সহীহ করার জন্য আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভূমিকা পালন করছে। তিলাওয়াতের শুদ্ধিতা আনতে হলে সহীহভাবে প্রশিক্ষণ নিতে হবে রমাদানের পূর্বেই। কুরআনের ভাষাকে বুঝতে হলে আরবি ভাষা ও অনুবাদ জানতে হবে।  সহীহ করার পরে আমরা কুরআনের অর্থ জানার চেষ্টা করতে পারি। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে কুরআন সুন্দর উচ্চারণে পড়ে না, সে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল নয়।” [সহীহ বুখারী : ৭৫২৭]

কুরআন শিক্ষাকে ফরজ করা হয়েছে। কেননা, পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “পড়, তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।”

অন্যদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নির্দেশ করে বলেন, “তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর।” [মুসনাদ আলজামি : ৯৮৯০]

উসমান রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই,  যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।” [সহীহ বুখারী : ৫০২৭]

সুতরাং কুরআন শিক্ষা করার ব্যাপারে রমাদানের পূর্বেই  এর শিক্ষা নেয়া জরুরি। কেননা পূর্ব থেকেই কুরআন সহীহ করা থাকলে রমাদানে তিলাওয়াত করাটা অনেক সহজ হবে।

৭. দৈনন্দিন পাঁচওয়াক্ত সালাতও

অন্যান্য ইবাদাতের সওয়াব রমাদান মাসে বৃদ্ধি পায়। রমাদানে একটি ফরজ ইবাদাত সত্তরটি ফরজ ইবাদাত পালনের সওয়াব পাওয়া যায়। এ মাসে কোনো নফল ইবাদাত পালনে ফরজ ইবাদাত পালনের সওয়াব পাওয়া যাবে। সুতরাং ইবাদাতের প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখার জন্য রমাদানের পূর্বেই তার প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

৮. দান-সাদাকার জন্য প্রস্তুত থাকা

রমাদানের সময় সওয়াবের পরিমাণ দিগুণ হওয়াতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দান-সাদাকাহ বহুগুণে বেড়ে যেত। “ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ছিলেন, আর রমাদান মাসে তিনি সবচে বেশি দান করতেন। যখন জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তার সাথে সাক্ষাৎ করে পরস্পরে কুরআন পড়তেন, তখন তিনি এতো অধিক দান করতেন যা প্রবাহিত বায়ুর চেয়েও অধিক।” [বুখারী, মুসলিম]

অতএব, মা-বোনদের, যার অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র রয়েছে, তারা পূর্ব থেকেই দান-সাদাকার জন্য অর্থ সঞ্চয় করে রাখবেন। আর যাদের অর্থ উপার্জনের কোনো ক্ষেত্র নেই, তারা তাদের সাংসারিক ব্যয়ের অর্থ থেকে, নিজ হাত খরচের থেকে অথবা স্বামীর কাছে আবদার করে অর্থ জমা করে রমাদানে দান করবেন। অর্থ ছাড়াও অন্যান্য সম্পদ যেমন অব্যবহৃত স্বর্ণ, কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র, গৃহস্থালীর টুকিটাকি ইত্যাদি থেকেও আমরা করতে পারি।  অপর এক হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি (অভাবীকে) দান কর, আল্লাহ তোমাকে দান করবেন।’ [বুখারী, মুসলিম]

আবু সাঈদ খুদরী রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, একবার ঈদুল ফিতরের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ঈদগাহে গিয়ে উপস্থিত মহিলাদের লক্ষ্য করে বলেন, হে নারী সম্প্রদায়, দান-খয়রাত কর কেননা আমাকে অবগত করানো হয়েছে দোজখের অধিকাংশ অধিবাসী তোমাদের নারী সম্প্রদায়েরই হবে। [দীর্ঘ হাদীসের অংশ বিশেষ বুখারী ও মুসলিম]

৯. হারাম কাজ ও কবিরা গুনাহ পরিহার

শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখার বাইরে যে কোনো অন্যায় হারাম কাজ ও কবিরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া। কেননা, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না, তার সিয়াম পালন কেবল পানাহার বর্জন আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [সহীহ বুখারী : ৬০৫৭]

১০. সাংসারিক কাজের ব্যস্ততা কমিয়ে আনা

বর্তমান সময়ে প্রতিটি পরিবারেই মা-বোনদের সাংসারিক কাজের ঝামেলা রয়েছে। আবার সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার ক্ষেত্রও রয়েছে। সব মিলিয়ে মা-বোনদের দুনিয়াবি ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। পবিত্র রমাদানে অবশ্যই একজন একনিষ্ঠ মুসলিমের উচিত হবে স্বাভাবিক কাজগুলো রুটিনমাফিক পরিকল্পনা নিয়ে সম্পন্ন করা। বাড়ি-ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, ঈদুল ফিতরের কেনাকাটা ইত্যাদি আনুসাঙ্গিক কাজগুলো রমাদানের পূর্বেই শেষ করার আন্তরিক চেষ্টা করা। পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে কাজের চাপ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে।

১১. জাকাত আদায়ের প্রস্তুতি গ্রহণ

আমাদের সমাজে সাধারণতঃ জাকাত আদায়ে সামর্থ্যবান লোকেরা অধিকাংশক্ষেত্রে রমাদান মাসেই আদায়ের চেষ্টা করে। সুতরাং যারা জাকাত প্রদানে নিসাব পরিমাণের মালিক এবং এক বছর পূর্ণ হয়েছে তারা রমাদানের পূর্বেই একটা পরিকল্পনা করবেন। এ বছর জাকাতের টাকার পরিমাণ, কোথায় জাকাত দেয়া তার জন্য ভালো হবে, সে ব্যাপারে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিবেন।

১২. বাৎসরিক আমলের প্লান

রমাদান মাসের প্রতিটি মুহূর্তই একজন মুসলিমের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদি সে প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারে।  কেননা আমরা জানি এ মাসে রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত, কদরের রাত। এ রাতের ইবাদাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। হাজার মাস প্রায় ৮৩ বছর ১০ দিনের সমান। অর্থাৎ একজন মানুষের পূর্ণ জীবনের সময়কাল, যা এক রাতেই লাভ করা যায়। সুতরাং বছরের শুরুতে ব্যক্তিগত আমলের প্লান যদি নেওয়া হয়, তার অর্ধেক বা পুরোটাই রমাদানে করার চেষ্টা করা। কেননা এ মাসে উত্তম রাত কদর রয়েছে। নেককাজের সওয়াব অন্যান্য মাসের চেয়ে এই মাসেই বেশি পাওয়া যায়। সুতরাং আমাদেরকে রমাদানের শেষ দশকের প্রতি রাতে কদরের তালাশে ইবাদাতে মশগুল থাকতে হবে। সেজন্য মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

১৩. আমলের ত্র“টি খুঁজে বের করা

মানুষ মাত্রই ভুল করে। নিজের ভুলগুলো স্বীকার করে নিয়ে তাওবার মাধ্যমে ভুলগুলো শুধরে নেওয়া জরুরি। রমাদানের পূর্বেই ব্যক্তিগত ত্র“টিগুলো একটা একটা করে খুঁজে বের করতে হবে।  আর আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে হবে পবিত্র রমাদানের পূর্বেই সেই ভুলগুলো পরিহার করা।

১৪. আগত রমাদানকে জীবনের শেষ রমাদান মনে করা

প্রত্যেক প্রাণীই মরণশীল। কখন মানুষ এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে কেউ বলতে পারে না।  যেহেতু  রমাদানে আমলের সওয়াব অনেকগুণ বেশি, তাই বেশি বেশি আমলের চেষ্টা করা। কেননা হতে পারে এ বরকতময় মাসটি আমার জীবনে আর নাও আসতে পারে।

১৫. সিলেবাস ঠিক করা

এ রমাদানে আমি কি বিষয়গুলো অধ্যয়ন করবো তা পূর্ব থেকে একটি সিলেবাস বা নোট তৈরি করা। যেমন : কুরআনের কোন কোন সূরা, হাদীসের বই, ইসলামী সাহিত্যের কোন বিষয়ের বই ইত্যাদি নির্দিষ্ট করা।

১৬. ওমরা পালনের সামর্থ্য থাকলে তা আদায়ের প্রস্তুতি নেয়া।

নেক কাজের মওসুম রমাদান মাসে পবিত্র ওমরা হজ্জ পালন করা অনেক সওয়াবের কাজ। রমাদানের পূর্বেই যারা ওমরা পালন করতে চান তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমাদান মাসে উমরা করা আমার সাথে হজ্জ আদায় করার সমতুল্য।” [সহীহ বুখারী : ১৮৬৩]

১৭. দু‘আ ও জিকির শিখা

চাঁদ দেখার দু‘আ, সেহরি, ইফতার, লাইলাতুল কদর, গুরুত্বপূর্ণ জিকিরসমূহ রমাদানের পূর্বেই শিখে নিতে হবে।

১৮. শারীরিক সুস্থতা রক্ষা করা

আমর বিন মায়মূর রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন, তুমি পাঁচটি বস্তুর পূর্বে পাঁচটি বস্তুকে গণীমত (সম্পদ) মনে কর : ১. বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে ২. পীড়িত হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে ৩. দরিদ্রতার পূর্বে স্বচ্ছলতাকে ৪. ব্যস্ততার পূর্বে তোমার জীবনকে।”  [হাকেম হা/৭৮৪৬, মিশকাত ২/৫১৭৪]

উল্লিখিত হাদীসটিতে সুস্থতাকে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। অসুস্থ শরীরে ইবাদাত পালন অনেকটাই কঠিন। তাই রমাদানে ইবাদাত নির্বিঘেœ করার জন্য স্বাস্থ্যের প্রতি পূর্ব থেকেই যতœবান হওয়া জরুরি।

১৯. স্বামী ও সন্তানদের সিয়াম পালনে উৎসাহ প্রদান

সিয়াম পালনে অভ্যস্ত করার জন্য মানসিক উৎসাহ প্রদান ও সাহস দেয়া। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “স্ত্রী নিজ স্বামীর ঘর ও তাঁর সন্তান সম্পর্কে দায়িত্বশীলা। তাকে এদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” [বুখারী  ও মুসলিম]

সুতরাং নারীরা অবশ্যই রমাদানের পূর্ব থেকেই স্বামী, সন্তান যদি সিয়াম পালনে অভ্যস্ত না থাকে, সেক্ষেত্রে তাদেরকে মানসিকভাবে উৎসাহ প্রদান করবে এবং সুন্দরভাবে বুঝাবে।

২০. সন্তানদের জন্য করণীয় ঠিক করা

আজকের সন্তানরাই আগামী দিনের কর্ণধার। জাতির যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়তে একজন আদর্শ মা-ই পারেন তার সন্তানদেরকে সঠিকভাবে পথ দেখাতে। ম্-াই পরিবারের আদর্শ শিক্ষিকা। তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে সন্তান ভালো কি মন্দ হবে। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন : “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে দোজখের আগুন থেকে বাঁচাও; মানুষ ও পাথর হবে সেই দোযখের জ্বালানী।” [সূরা তাহরীম : ৬]

অতএব, মা-বোনদের উচিত রমাদানে তার সন্তানকে সিয়াম-সালাত পালনে বাধ্য করা, যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পর্যায়ক্রমে প্রতি বছরে সিয়াম পালনের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া। সর্বোপরি, ইসলামী বিধান পালনে তাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।

২১. আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সু-সংবাদ প্রদান

আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গী-সাথীদের এ মর্মে সু-সংবাদ শোনাতেন, তোমাদের সমীপে রমাদান মাস এসেছে। এটি এক মোবারক মাস। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর এ মাসের সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দ্বার খোলা হয়। বন্ধ রাখা হয় জাহান্নামের দরজা। শয়তানকে বাঁধা হয় শেকল্,ে এ মাসে একটি রজনী  রয়েছে, যা সহস্র মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে যেন যাবতীয় কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।”

সুতরাং এ সংবাদ অবশ্যই আমাদের সবাইকে জানাতে হবে যে, এ মাস আসার পূর্বেই এর যথার্থ মূল্যায়নের প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি।

২২. রমাদানকে স্বাগত জানানোর সুন্নাত পদ্ধতি অনুসরণ

রমাদান মাসকে স্বাগত জানানোর জন্য সুন্নাত পদ্ধতির অনুসরণ করতে হবে। আর তা হলো রমাদানের চাঁদ দেখে দু’আ পাঠ করা। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চাঁদ দেখতেন, তখন তিনি বলতেন, “হে আল্লাহ আপনি একে আমাদের ওপর বরকত, ঈমানের সাথে এবং সুস্থতা ও ইসলামের সাথে উদিত করুন, তোমার এবং আমার রব হলেন আল্লাহ।” [তিরমিজি  : ৩৪৫১, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন। মুসনাদ আহমাদ : ১৩৯৭। সহীহ ইবন হিব্বান : ৮৮৮]

২৩. ফরজ কাজা সিয়াম পূর্ণ করা

যৌক্তিক রমাদানের সিয়াম বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মা-বোনদের কাজা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আমাদের চেষ্টা করতে হবে এ বছরের রমাদান মাস আসার আগেই বিগত রমাদানের কাজা সিয়ামগুলো আদায় করে নেয়া। আবু সালামা রাদিআল্লাহু আনহাকে বলতে শুনেছি, আমার রমাদানের কিছু দিনের সিয়াম পালন বাদ থাকত। সেগুলো আমি শাবান ছাড়া কাজা করতে পারতাম না।” [বুখারী, মুসলিম : কিতাবুস সিয়াম]

ইয়াহইয়া বলেন, এর কারণ ছিল তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবায় ব্যস্ত থাকতেন।

২৪. আল্লাহর সাহায্য চাওয়া

প্রতিটি মুসলিম নারী পবিত্র রমাদানের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণের পর একান্ত আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহ তা‘আলার কাছে নমনীয়, বিনয়ী হয়ে সাহায্য চাইবে, যাতে সে রমাদানের প্রতিটি মুহূর্ত সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে। আর আল্লাহ তা‘আলা মুমিন বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহশীল। তিনি মুমিনদের সাহায্য করতে সব সময় প্রস্তুত। আলকুরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণ এবং মুমিনদের দুনিয়া ও আখিরাতে সাহায্য করবো।” [সূরা মুমিন : ৫১]

সুতরাং আসুন আমরা আখিরাতের কাক্সিক্ষত সফলতা জান্নাতুল ফেরদৌস লাভের আশায় পবিত্র মাস রমাদানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করি। নিজের নফসকে অন্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণে এনে সত্যের দিকে ধাবিত করি। মহান অতিথি রমাদান মাসকে বরণ করে এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তগুলো এমন আমলের মধ্য দিয়ে কাটানোর প্রস্তুতি নেই, যা মহান আল্লাহ তা‘আলার কাছে গ্রহণীয় হবে। আমরা যেন সেই লোকদের দলভুক্ত না হই, যারা রসনাতৃপ্তির জন্য বিশাল আয়োজনে ব্যস্ত থেকে সালাত, ইবাদাতের কথা ভুলে যায়। আমরা যেন সেই লোকদের মতো না হই, যারা রমাদান মাস পাওয়ার পরও আল্লাহর কাছে মাগফিরাত না পেয়ে নিজেকে আল্লাহর ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদ দু‘আর যোগ্য বানায়। আল্লাহ আমাদের প্রতিটি নেক আমল কবুল করুন। আমীন।

#লেখক#মাহফুজা সুলতানা উম্মেহানী। (বিশিষ্ট লেখক ও ইসলামী চিন্তাবিদ)

যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন।”

[caption id="attachment_40470" align="aligncenter" width="1024"] যাকাত আদায়ে উপকারিতা!

যাকাত ইসলামের এক বিশেষ রোকন, যার উপর বান্দার দুনিয়া
গবেষণার মাধ্যমেই আমি ইসলামকে খুঁজে পেয়েছি: জুলিয়াস অগাস্টিনআর্জেন্টিনার নওমুসলিম 'জুলিয়াস অগাস্টিন'
যাকাত কেন ও কিভাবে আদায় করতে হবে ?আরটিএমনিউজ২৪ডটকম, ইসলাম ডেস্কঃ যাকাত

যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন।”
[caption id="attachment_58663" align="aligncenter" width="800"] রমজান মাসের শেষ দশকের বিশেষ ফজিলত রয়েছে এবং আছে বেশ কিছু
[caption id="attachment_40470" align="aligncenter" width="1024"] যাকাত আদায়ে উপকারিতা![/caption]যাকাত ইসলামের এক বিশেষ রোকন, যার উপর বান্দার দুনিয়া
[caption id="attachment_58441" align="aligncenter" width="800"] গবেষণার মাধ্যমেই আমি ইসলামকে খুঁজে পেয়েছি: জুলিয়াস অগাস্টিন[/caption]আর্জেন্টিনার নওমুসলিম 'জুলিয়াস অগাস্টিন'
[caption id="attachment_40470" align="aligncenter" width="1024"] যাকাত কেন ও কিভাবে আদায় করতে হবে ?[/caption]আরটিএমনিউজ২৪ডটকম, ইসলাম ডেস্কঃ যাকাত