, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০

Avatar admin

ফিলিস্তিনি পোশাকে ভয়াবহ ইহুদী গোয়েন্দা দল মুস্তারেবিন”

প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৬ ১০:২৫:৫৯ || আপডেট: ২০১৯-১২-০৬ ১০:২৫:৫৯

Spread the love

ইসরায়েলের প্রধান এবং সবচেয়ে ‘কুখ্যাত’ গোয়েন্দা বাহিনী হচ্ছে ‘মোসাদ’, যাদের কাজ বিশেষ অপারেশন পরিচালনা করা। এছাড়া আছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘আমান’ এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ বা ‘শাবাক’। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা, সেসব দেশে জটিল কোনো অভিযান পরিচালনা করা, তাদের সামরিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন নস্যাৎ করে দেয়া, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করা প্রভৃতি দায়িত্ব সাধারণত মোসাদের উপর বর্তায়। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের মাঝেমাঝে ছদ্মবেশী গোয়েন্দা নিয়োগ করতে হয়। 
‘মোসাদ’ ছাড়াও ইসরায়েলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা আছে যাদের কাজ বহির্বিশ্বে নয়, শুধুমাত্র ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের কাছে এরা ‘মুস্তারেবিন’ নামে পরিচিত। ‘মুস্তারেবিন’ (مستعربين) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘যারা দেখতে আরবদের মতো’ অথবা ‘যারা আরবদের মতো জীবনযাপন করে’। হিব্রুতে এদের পরিচয় ‘মুস্তারেভিম’ নামে। 

এরা পৃথক কোনো গোয়েন্দা বাহিনী নয়, বরং ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ), ইসরায়েলি বর্ডার পুলিশ এবং ইসরায়েলি পুলিশের অধীনে কর্মরত বিশেষ ইউনিট, যাদের মূল কাজ ফিলিস্তিনি সেজে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা। মুস্তারেবিনরা ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা এখনো পুরাপুরি জানা যায়না। যেহেতু তারা আন্ডারকভার এজেন্ট, তাই তাদের কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত গোপনীয়। বিভিন্ন সময় সাবেক গোয়েন্দাদের এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে তাদের সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। 

মুস্তারেবিনরা ছদ্মবেশে ফিলিস্তিনিদের সাথে মিশে যায় এবং তাদের বিভিন্ন আন্দোলন-মিছিলে অংশ নিয়ে সেগুলোর গতিপ্রকৃতি, পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে অবহিত করে। মুস্তারেবিনরা আন্দোলনকারীদের ছদ্মবেশে মিছিলে অনুপ্রবেশ করে। অন্যান্য ফিলিস্তিনি যুবকের মতো তাদের মুখও থাকে কালো কাপড় অথবা সাদাকালো চৌকোণা নকশাবিশিষ্ট ‘কেফায়া’ দ্বারা পেঁচানো। তারা মিছিল থেকে ইসরায়েলবিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে, মাঝে মাঝে ইসরায়েলি সেনাদের উপর পাথরও নিক্ষেপ করে।

মিছিল যখন যথেষ্ট বড় আকার ধারণ করে এবং কিছু মিছিলকারী যখন পাথর নিক্ষেপ করার জন্য ইসরায়েলি সেনাদের কাছাকাছি এগিয়ে যায়, ঠিক তখন এই মুস্তারেবিনদের আসল রূপ প্রকাশিত হয়। তারা দল বেঁধে মিছিলকারীদের কয়েকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পকেটে লুকিয়ে রাখা পিস্তল বের করে আকাশের দিকে গুলি ছুঁড়ে অন্য মিছিলকারীদের দূরে সরিয়ে দেয়, প্রয়োজনে তাদের উপর গুলি করে। 

মুস্তারেবিনদের পিস্তল থেকে গুলির আওয়াজ আসামাত্র ইসরায়েলি সেনারা আক্রমণ শুরু করে। তারা এগিয়ে এসে মুস্তারেবিনদের হাতে আটক হওয়া ফিলিস্তিনিদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পলায়নরত মিছিলকারীরা একে অপরকে চিৎকার করে সতর্ক করে দিতে থাকে, ‘মুস্তারেবিন এসেছে! মুস্তারেবিন এসেছে!’ ফিলিস্তিনিদের চোখকে ধোঁকা দিয়ে, তাদের সন্দেহের উদ্রেক না করে, তাদের সাথে পরিপূর্ণভাবে মিশে যাওয়ার জন্য মুস্তারেবিনদের কঠোর ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দখলকৃত ফিলিস্তিন এর ভূমিতে অপারেশন চালানোর জন্য তাদের ফিলিস্তিনিদের মতো আচরণ করতে, তাদের মতো করে চিন্তা করতে শেখানো হয়। 

ফিলিস্তিনিদের মাতৃভাষা আরবি। বিশ্বের সব ভাষার মতোই আরবি ভাষারও বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপভেদ আছে। বিভিন্ন আরব দেশে ব্যবহৃত আরবি ভাষার টান এবং শব্দের মধ্যে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। একই দেশের বিভিন্ন শহরেও ভাষার ভিন্নতা আছে। মুস্তারেবিন এজেন্টদের এমনভাবে ট্রেনিং দেয়া হয়, যেন তারা ফিলিস্তিনের নির্দিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক আরবি নিজেদের মাতৃভাষার মতো করে সাবলীলভাবে আয়ত্ত করতে পারে। 

একজন মুস্তারেবিন এজেন্টকে মোট ১৩ থেকে ১৫ মাসের ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার মধ্যে ৪ মাসই থাকে ভাষা এবং আচার-আচরণগত ট্রেনিং। প্রথম সাড়ে ৬ মাসের ট্রেনিং মূলত পদাতিক বাহিনীর ট্রেনিং, যা সব ধরনের সেনা কর্মকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক। এই ট্রেনিং প্রদান করা হয় আইডিএফের স্পেশাল ট্রেনিং সেন্টারের মিটকান অ্যাডাম আর্মি বেজে। তারপর দুই মাসের ট্রেনিং হয় কাউন্টার টেরোরিজম সংক্রান্ত। এসময় তাদের ফিলিস্তিনের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক গঠন এবং সেগুলোতে বিচরণের পদ্ধতি শেখানো হয়। এরপর শুরু হয় মুস্তারেবিন ট্রেনিং। এ পর্যায়ে আরবি ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে আরবদের মানসিকতা, পোশাক, চুলের স্টাইল সব কিছুর উপর ট্রেনিং দেয়া হয়। সঠিকভাবে ছদ্মবেশ নেওয়ার জন্য তাদের পরচুলা এবং কন্টাক্ট লেন্স সরবরাহ করা হয়। ফিলিস্তিনিদের চোখকে নির্ভুলভাবে ফাঁকি দিতে সক্ষম হওয়ার জন্য এসময় তাদের মুসলমানদের মতো নামাজ পড়া, রোজা রাখাও শেখানো হয়। সর্বশেষের এক মাসে বিভিন্ন ধরনের জটিল অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

ইসরায়েল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্টয়েন শালহাতের মতে, মুস্তারেবিনদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত ফিলিস্তিনিদের গ্রেপ্তার করা। তাদের অনেকগুলো ইউনিট আছে। সর্বপ্রথম মুস্তারেবিন ইউনিটটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৪২ সালে। এ ইউনিটটি ছিলো ফিলিস্তিনে বসবাসরত তৎকালীন ইহুদী সম্প্রদায়ের মিলিশিয়া বাহিনী ‘হাগানা’, যা প্রধান বিভাগ ‘পালমাকে’র অংশ। ‘হাগানা’ মিলিশিয়া থেকে পরবর্তীতে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের সৃষ্টি হয়েছিলো। 

প্রথম দিকে সৃষ্ট মুস্তারেবিনদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়না। কারণ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কিছুদিন পরপর, বিশেষ করে যখনই এই গোপন অপারেশনগুলো সম্পর্কিত কোনো সংবাদ প্রকাশ হয়ে পড়ে, তখনই এই ইউনিটগুলোকে বিলুপ্ত করে দেয় এবং পরবর্তীতে ভিন্ন নামে নতুন কোনো ইউনিট চালু করে। 

শালহাতের মতে, মুস্তারেবিনদের সবচেয়ে পরিচিত ইউনিটগুলোর একটি হচ্ছে ‘রিমন’ ইউনিট। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৭৮ সালে। এরা প্রধানত গাজা উপত্যকায় কার্যক্রম পরিচালনা করতো। এছাড়া আশি-নব্বইয়ের দশকে ‘শিমশন’ (ইউনিট ৩৬৭) নামে আরেকটি ইউনিট সক্রিয় ছিলো, তবে ১৯৯৪ সালে অসলো শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর ইসরায়েল তাদের বিলুপ্ত করে। ‘রিমন’ ইউনিট ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাজায় সক্রিয় ছিলো।

মুস্তারেবিনরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলো প্রথম ইন্তিফাদার সময় গাজা উপত্যকায়। পরবর্তীতে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়ার পর এজেন্টদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয় এবং দখলকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে নিযুক্ত করা হয়। পশ্চিম তীরে সক্রিয় ইউনিটগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘দুভদেভান’ (ইউনিট ২১৭)। সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইহুদ বারাকের হাতে ১৯৮০ সালে এটির প্রতিষ্ঠা হয়, যা এখনো সক্রিয় আছে।

মুস্তারেবিনরা ফিলিস্তিনিদের সাথে ছদ্মবেশে মিশে থাকলেও সাবধানতা অবলম্বন করলে তাদের উপস্থিতি বোঝা সম্ভব হয়। আল জাজিরার সাথে সাক্ষাৎকারে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আন্দোলনকারীরা যখন ইসরায়েলি সেনাদের দিকে পাথর মারাতে শুরু করার পরও প্রথমে তারা পাল্টা গুলি করেনি, তখনই তার সন্দেহ হয়েছিলো মিছিলের ভেতর ইসরায়েলের গুপ্তচর আছে বলে তারা গুলি করছিলো না। পরবর্তীতে ঠিকই মিছিল থেকে মুস্তারেবিনরা বেরিয়ে অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনিকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। 

ওই প্রত্যক্ষদর্শী আরো বলেন, ‘পোশাক নির্বাচনের মাধ্যমেও সাবধানতা অবলম্বন করা সম্ভব। যেহেতু গুপ্তচরদের তাদের অস্ত্র জামার ভেতরে লুকিয়ে রাখতে হয়, তাই তাদের পক্ষে প্যান্টের ভেতর শার্ট প্রবেশ করিয়ে পরা সম্ভব হবেনা। সেক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিরা সবাই যদি প্যান্টের ভেতর শার্ট প্রবেশ করিয়ে পরে, তাহলে খুব সহজে এই এজেন্টরা ধরা পড়ে যাবে।’

মুস্তারেবিনদের তৎপরতার কথা বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় এসেছিলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর ফিলিস্তিনজুড়ে বিভিন্ন প্রতিবাদ মিছিলে পুনরায় তাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। রামাল্লাহ শহরে এরকম একটি মিছিলে যখন ফিলিস্তিনিবেশী এজেন্টরা হঠাৎ পিস্তল বের করে প্রতিবাদকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ তোরকমান এবং আব্বাস নোমানী সেই মুহূর্তের কয়েকটি দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করতে সক্ষম হন। এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমে নতুন করে মুস্তারেবিনদের কথা উঠে আসতে শুরু করে। সুত্রঃ বাংলা আপডেট।

Logo-orginal