, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০

Avatar jamil Ahamed

ইতিহাসে চরমভাবে উপেক্ষিত ঢাবির প্রতিষ্ঠাতা নবাব স্যার সলিমুল্লাহ”

প্রকাশ: ২০২০-০১-১৭ ১০:৩৯:১০ || আপডেট: ২০২০-০১-১৭ ১০:৩৯:১০

Spread the love

বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনের নেতৃত্বের প্রথম সারির এই কাণ্ডারি ইতিহাসে আজ চরমভাবে উপেক্ষিত। তাঁকে নিয়ে আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম স্মরণসভা তো দুরের কথা, বরং ইতিহাসে প্রাপ্য তাঁর সম্মান ও জায়গা টুকুও কেড়ে নিয়ে তাঁকে বিস্মৃত করে রাখা হয়েছে। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এনে দিল মায়ের ভাষা, একটি দেশ। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ও নেপথ্যের অন্যতম কারিগর ছিলেন তৎকালীন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। আজ তাঁর ১০৫তম মৃত্যুবার্ষিকী।

নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকার আহসান মঞ্জিলে ১৮৭১ সালের ৭ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা এবং পিতামহের নাম যথাক্রমে নবাব স্যার খাজা আহসানুল্লাহ ও নবাব স্যার খাজা আব্দুল গণি। নীরবে-নিভৃতে ঢাবির স্বপ্নদ্রষ্টা এ নবাবের ১০৫তম মৃত্যুবার্ষিকী অতিবাহিত হয়েছে।

১৯০৬ সালের নভেম্বরে সলিমুল্লাহ সমগ্র ভারতের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের নিকট পত্রালাপে নিজের অভিপ্রায় তুলে ধরেন এবং সর্বভারতীয় মুসলিমদের সংগঠন তৈরির প্রস্তাব রাখেন। ১৯০৬ সালের ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর নবাবের শাহবাগস্থ পারিবারিক বাগান বাড়িতে সর্বভারতীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দসহ প্রায় দু সহস্রাধিক সুধী যোগ দেন। এতে তাঁর ছয় লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়। নবাব সলিমুল্লাহ অল ইন্ডিয়া মুসলিম কনফেডারেন্সী (Muslim All India Confederacy) সর্বভারতীয় মুসলিম সংঘ গঠনের প্রস্তাব দেন।

হাকিম আজমল খান, জাফর আলী এবং আরো কিছু প্রতিনিধি প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেন। কিছু প্রতিনিধির আপত্তির প্রেক্ষিতে কনফেডারেন্সী শব্দটি পরিত্যাগ করে লীগ শব্দটিকে গ্রহণ করা হয়। অবশেষে সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (All India Muslim League) গঠিত হয়। সেই সময় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী সম্পাদিত দি বেঙ্গলী পত্রিকা নবগঠিত মুসলিম লীগকে সলিমুল্লাহ লীগ হিসেবে অভিহিত করে।

সেদিন মুসলিমলীগ প্রতিষ্ঠিত না হলে পাকিস্তান সৃষ্টি হতো না। পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে আওয়ামী মুসলিমলীগ হতো না। আবার আওয়ামী মুসলিমলীগ না হলে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের জন্ম হতো না। আওয়ামীলীগের জন্ম না হলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। ইতিহাস গোড়াপত্তনে ও বাঙালি জাতির অধিকার সচেতন করতে যার এতো অনবদ্য অবদান তাঁকেই আমরা বেমালুম ভুলে আছি। অনেকটা বলা যায় আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে রেখেছি। ইতিহাসের সেই প্রাণপুরুষ ও শিকড়কে আমরা নিঃসঙ্কোচে ভুলে আছি।

কতটা অকৃতজ্ঞ জাতি আমরা। সম্মান দিলে কখনো সম্মান কমে না বরং বাড়ে। এই সাধারণ কথাটিও আমরা ভুলে গেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সলিমুল্লাহর নামে প্রতিষ্ঠিত সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের একজন আবাসিক ছাত্র হিসেবে হলে ছয় সাত বছর থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই সুবাদে এই ক্ষণজন্মা ও মহানুভব মানুষটিকে জানার স্পৃহা ছিল অপরিসীম।

পূর্ববঙ্গের চাষা-ভূষা মুসলমানদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়ার স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নবাব সলিমুল্লাহ ২০০ বিঘার বেশি জমি দান করেন।নতুন গবেষকদের মতে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জমি দান করেন নি। তাদের মতে এটি একটি শ্রুতি বা মিথ। দান করার মতো জমি নবাব পরিবারের ছিল না বলে তাদের দাবি।

তারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারি খাসজমিতে। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও নবাব সলিমুল্লাহ জীবদ্দশায় এই বিশ্ববিদ্যালয় দেখে যেতে পারেন নি। বঙ্গভঙ্গ রহিত হওয়ার পর থেকেই নবাব সলিমুল্লাহ স্বপ্ন ভঙ্গের ব্যাধিতে ভুগতে থাকেন। এ কে ফজলুল হককে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত করে নবাব সলিমুল্লাহ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন।

১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতা থেকে তাঁর ঢাকা ফেরার কথা ছিল। তিনি ফিরলেন, তবে জীবিতাবস্থায় নয়। ১৬ জানুয়ারি রাত ২-৩০ মিনিটে তার কলকাতার চৌরঙ্গী রোডস্থ ৫৩ নম্বর বাড়িতে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে নবাব সলিমুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ১৬ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় কলকাতায় আলিয়া মাদরাসা সংলগ্ন ওয়েলসলি স্কয়ার পার্কে তাঁর জানাজা নামাজ শেষে ১৭ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর লাশ ঢাকায় আনা হয়। ঢাকায় দুটি জানাজা শেষে নবাবকে দাফন করা হয় বেগমবাজারে পারিবারিক গোরস্তানে। নবাবের আকস্মিক মৃত্যু গবেষকদের কাছে আজও রহস্যে ঘেরা।

ঢাকার মতো একটি অবহেলিত ও অনুন্নত প্রাচীন নগরে একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তখন অনেকের কাছেই ছিল অযৌক্তিক। কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক,সমাজসংস্কারক, প্রশাসকসহ গত ৯৯ বছরে যে বিদ্বৎসমাজ তৈরি হয়েছে, তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা নওয়াব সলিমুল্লাহর অবদান অনস্বীকার্য।

১৯০২ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠায় তিনি তাঁর পিতার দেয়া পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুসারে ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা মঞ্জুর করেন। ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ আরো অর্থ দান করে পিতার নামে স্কুলটির নামকরণ করেন ‘আহসান উল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং।’

১৯৪৭ সালের পর স্কুলটি কলেজে উন্নীত হয়। মুসলিম লীগ সরকার ১৯৬২ সালে কলেজটির উন্নয়ন করে প্রতিষ্ঠা করে পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় যা ছিল তদানীন্তন প্রদেশের প্রথম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতার পর এটির নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি (বুয়েট) নবাব সলিমুল্লাহর দান করা জমিতে বুয়েট প্রতিষ্ঠিত।

এতিম মুসলিম ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য ১৯০৮ সালে আজিমপুরে ২৮ বিঘা জমি দান করে সলিমুল্লাহ প্রতিষ্ঠা করেন এতিম খানা পরবর্তীতে নামকরণ করা হয় নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা। লেখাপড়ার জন্য এতিমখানায় ছেলেদের জন্য একটি এবং মেয়েদের জন্য একটি করে দুটি স্কুল রয়েছে। শত শত এতিম ছেলেমেয়ের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও লেখাপড়ার যাবতীয় ব্যয় নবাব সলিমুল্লাহ মৃত্যু পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে ব্যয় করেছেন।

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই এতিমখানাটি বর্তমানে বিভিন্ন মানুষের দান করা অর্থে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া কৃষি, শিল্প খাতে, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ছাত্রাবাস নির্মাণে এবং অন্যান্য যে কোনো ধরনের সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নবাব সলিমুল্লাহ পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এসব মহৎ কাজের উদ্যোগী হিসেবে নবাব সলিমুল্লাহ অক্ষয় কীর্তির অংশীদার হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সূত্রঃ দ্যা ক্যাম্পাস ।

Logo-orginal