, সোমবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২০

admin

লাখো মুসল্লীর ভালবাসায় চির বিদায় নিলেন হবিগঞ্জের আল্লামা তাফাজ্জুল হক

প্রকাশ: ২০২০-০১-০৬ ১৬:১৫:৩২ || আপডেট: ২০২০-০১-০৬ ১৬:১৫:৩২

Spread the love

(ছবি, ড্রোন দিয়ে তোলা, নয়া দিগন্ত)
হবিগঞ্জে শায়খুল হাদিস আল্লামা তাফাজ্জুল হকের জানাযার নামাজে লক্ষাধিক মুসল্লী অংশগ্রহণ করেন। জানাযার নামাজে হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ সড়কের চৌধুরী বাজার থেকে আলমপুর নামক স্থান পর্যন্ত দুই বর্গকিলোমিটার দৈর্ঘ রাস্তা, হবিগঞ্জ উমেদনগর টাইটেল মাদ্রাসার বিশাল মাঠ, অন্তত ৬টি মাদ্রাসা ভবনের প্রায় সকল তলা, বিভিন্ন দোকান, কৃষি জমি, খোয়াই নদীর ব্রিজ এলাকা লোকে লোকারন্য হয়ে যায়।

সোমবার ফজরের নামাজের পর থেকেই মুসল্লিরা টাইটেল মাদ্রাসা মাঠে জড়ো হতে থাকেন। সকাল ৮টার মধ্যে পুরো মাঠ মুসল্লীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে হবিগঞ্জ শহরের সবকটি প্রবেশ মুখে যানজট শুরু হয়।

জানাযার নামাজস্থল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের শহরের বাইপাস কামড়াপুর, পিটিআই সংলগ্ন চৌরাস্তা এবং সওদাগর মসজিদ এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ সকল যানবাহন আটকে দেয়। মুসল্লিরা পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জানাযার নামাজে অংশগ্রহণ করেন। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে পুরো শহর অনেকটা থমকে দাঁড়ায়। জানাযার স্থান এলাকায় গাড়ি বা পায়ে হেঁটে চলাচলেরও কোনো সুযোগ ছিল না।

জানাযার নামাজে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সুনামগঞ্জের এমপি শাহিনুর পাশা চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আলহাজ্জ জিকে গউছ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি নুর হোসাইন কাসেমী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা নুরুল ইসলাম অলিপুরী, ব্রাহ্মনবাড়িয়ার আল্লামা আনসারী, সিলেট সুনামগঞ্জ মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলার বিশিষ্ট আলেম, পীর মাশায়েখগন অংশগ্রহণ করেন।

সকাল সোয়া ১০টার দিকে জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মরহুম আল্লামা তাফাজ্জুল হকের বড় ছেলে মাওলানা হাফেজ মাসরুরুল হক, উপস্থিত উচ্চপর্যায়ের আলেমদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মরহুমের ৫ সন্তান হাফেজ মাসরুরুল হক, হাফেজ তাসনিমুল হক, হাফেজ তাফহিমুল হক, হাফেজ মামনুনুল হক, হাফেজ মাবরুরুল হক মরহুমের লাশ মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে খনন করা কবরে শায়িত করেন।

মৃত্যুর সংবাদ জানার সাথে সাথে রোববার রাতেই সিলেট রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র মরহুমের লাশ দেখতে হবিগঞ্জে চলে আসেন। তাছাড়া বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ রোববার বিকাল থেকেই মরহুমের লাশ একনজর দেখতে মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে ভিড় করেন।

হবিগঞ্জ তথা দেশের পূর্বাঞ্চলের শীর্ষ স্থানীয় আলেমে দ্বীন আল্লামা তাফাজ্জুল হক রোববার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ইন্তেকাল করেন তিনি। ওইদিন সকালে তেতৈয়া মহিলা মাদ্রাসায় হাদিস শাস্ত্র পড়িয়েছিলে, দুপুরে জমিয়তে উলামার একটি সভায় অংশ গ্রহণ করেন, জোহরের নামাজের পর দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেয়ার সময় বুকে ব্যথা অনুভব করেন। দ্রুত তাকে সিলেটে নিয়ে যাওয়ার পথে ইন্তেকাল করেন আল্লামা তাফাজ্জুল হক।

হবিগঞ্জ জামেয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া টাইটেল মাদ্রাসা, হবিগঞ্জ তেতৈয়া মাদানীনগর মহিলা টাইটেল মাদ্রাসা, নুরুল হেরা জামে মসজিদসহ বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা তাফাজ্জুল হকের মৃত্যুতে হবিগঞ্জে শোকের ছায়া নেমে আসে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে অধ্যায়ন ও শিক্ষকতা পেশায় জড়িত ছিলেন তিনি। আল্লামা আহমেদ শফীর পরেই আল্লামা তাফাজ্জুল হককে দেশের পূর্বাঞ্চলের বয়োজেষ্ট আলেম হিসাবে গন্য করা হয়। তার আমন্ত্রণে হবিগঞ্জের জামেয়া মাদ্রাসায় সৌদী আরবের দুই পবিত্র মসজিদের ইমাম, বায়তুল মোকাদ্দসের ইমামসহ দেশ ও বিদেশের বহু আলেম এসেছেন।

হবিগঞ্জের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দ্বীন শায়খুল হাদীস আল্লামা তাফাজ্জুল হক ইসলাম প্রিয় মানুষের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। তাকে ঘিরে সাধারণ মুসল্লিদের আবেগ অনুভূতি ছিল বাধ ভাঙ্গা জুয়ারের মতো।

১৯৪৪ সালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কাটাখালি গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা মাওলানা আব্দুন নুর ছিলেন বড় মাপের আলেম। ৫ ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। লেখাপড়ার শুরুটা বাবার হাত ধরেই। তারপর রায়ধর মাদ্রাসা। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায়। বাংলাদেশের প্রখ্যাত পীর ও আলেমে দ্বীন চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক শায়খুল হাদীস আল্লামা আহমদ শফি আল্লামা তাফাজ্জুল হকের শিক্ষক।

চট্টগ্রাম থেকে আল্লামা তাফাজ্জুল হক চলে যান পাকিস্তানে। পাকিস্তানের লাহোর জামেয়া আশরাফিয়া মাদ্রাসায় তিনি লেখাপড়া করেন। সেখানকার তার উস্তাদ শায়খুল হাদিস আল্লামা রসুল খান ছিলেন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় আলেমে দ্বীন। লাহোর থেকে জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্যে আল্লামা তাফাজ্জুল হক চলে যান ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি উস্তাদ শায়খুল হাদিস ফখরুদ্দিনের (র) সান্নিধ্য লাভ করেন। আল্লামা ফখরুদ্দিন (র) ছিলেন একাধারে পীর ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা। ভারত পাকিস্তানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞান আহরনের পর তিনি চলে আসেন বাংলাদেশে। শিক্ষকতার পেশা দিয়ে তার জ্ঞান বিতরণ কার্যক্রম শুরু। শিক্ষা গ্রহণটা যেহেতু বাড়ি থেকে শুরু, শিক্ষা প্রদানটাও প্রায় একই স্থান থেকেই শুরু।

রায়ধর মাদ্রাসার মুহাদ্দিস হিসেবে তিনি প্রথম শিক্ষকতার পেশা শুরু করেন। একবছর তিনি সেখানে ছিলেন। পরে চলে যান কুমিল্লার বরুরায়। সেখানেও তিনি শিক্ষকতা করেন। ময়মনসিংহের জামেয়া আশরাফুল উলুম মাদ্রাসাসহ ময়মনসিংহ জেলায় তিনি বেশ কয়েক বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর পর তার উস্তাদরা তাকে পাঠিয়ে দেন নিজ জেলা হবিগঞ্জে। প্রথমে তাকে মুহাদ্দিস হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় উমেদনগর মাদ্রাসায়। ১৯৫৭ সালে শায়খুল হাদিস মিছবাহুজ্জামানের প্রতিষ্ঠিত উমেদনগর মাদ্রাসায় তখনো দাওরায়ে হাদিস বিভাগ ছিল না। আল্লামা তাফাজ্জুল হক এসে দাওরায়ে হাদিস বিভাগ চালু করেন। এরপর নিরন্তরভাবে হাদিস শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন তিনি। ৭১ থেকে ২০২০ সাল। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি হাদিস শাস্ত্র পড়িয়ে কয়েক হাজার মুহাদ্দিস তৈরী করেন। যারা এখন দেশ বিদেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

শুধুই কি পুরুষরা হাদিস শিক্ষা অর্জন করবে? মহিলারা বাদ যাবে কেন? শুধু এই চিন্তায় তিনি ১৯৯৭ সালে হবিগঞ্জের তেতৈয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন মাদানী নগর মহিলা মাদ্রাসা। এই পর্যন্ত মহিলা মাদ্রাসা থেকে ২২৫ জনেরও বেশি মহিলা মুহাদ্দিস সনদ নিয়ে বের হয়েছেন। তারা এখন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রতিটি পরিবারে হাদিস শিক্ষা প্রদান করছেন। শায়খুল হাদিস তাফাজ্জুল হক বিয়ে করেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ এর বড় হুজুর হিসাবে খ্যাত বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রবক্তা এবং বৃটিশদের কালো পতাকা প্রদর্শনকারী মাওলানা আরিফে রাব্বানীর কন্যাকে। তার শ্যালক খালেদ সাইফুল্লাহ এখন ময়মনসিংহের জনপ্রিয় আলেম। তাফাজ্জুল হকের ৫ ছেলের মধ্যে ৫জনই প্রখ্যাত মাওলানা। তাদের মাঝে ৪জন কোরআানে হাফেজ। ৪ কন্যার মধ্যে সবাই টাইটেল পাশ আলেমা। নাতী নাতনীদের প্রায় সবাই কোরআনে হাফেজ ও মাওলানা। বড় ছেলে-হাফেজ মাসরুরুল হক উমেদনগর মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক। ২য় ছেলে-হাফেজ তাসনিমুল হক মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের পরিচালক, ৩য় ছেলে- হাফেজ তাফহিমুল হক একজন মুহাদ্দিস, ৪র্থ ছেলে মাওলানা মামনুনুল হক মহিলা মাদ্রাসার পরিচালক, ৫ম ছেলে মাবরুরুল হক একজন মাওলানা। ৪ কন্যার সবাই মাদ্রাসার শিক্ষিকা। ৫ ভাইয়ের মধ্যে তাফাজ্জুল হক সবার বড়। ২য় ভাই লন্ডন প্রবাসী ইমদাদুল হক একজন শায়খুল হাদিস। ৩য় ভাই হাফেজ শামসুল হক সাদী একজন প্রখ্যাত মাওলানা। শামসুল হক সাদীর ২ ছেলে কোরআনে হাফেজ। ৪র্থ ভাই ডাক্তার সিরাজুল হক আমেরিকা প্রবাসী, ৫ম ভাই হাফেজ মাওলানা আহমদুল হক ওআইসি ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর।

বিভিন্ন প্রয়োজনে আল্লামা তাফাজ্জুল হক লন্ডন আমেরিকা কানাডাসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সফর করেন। তিনি জীবনে ৩৮ বার পবিত্র হজ্জব্রত পালন করেন। তার উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি নুর হোসাইন কাসেমী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা নেজাম উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন আলেম এখন দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। গরীব দুঃখীদের সাহায্যার্থে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন খুদ্দামুদ্দিন সমিতি। এই সমিতি থেকে বিভিন্ন প্রকাশনাও বের করা হয়। সপেদ লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী, টুপি-ই তার প্রিয় পোষাক। সাধারণ মানুষের মতো চলতে ভালোবাসতেন আল্লামা তাফাজ্জুল হক। সুত্রঃ নয়া দিগন্ত।

নিউজ ডেস্ক: দশ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ, কষ্টের তীব্রতা সহ্য করে যে মানুষটি সন্তানের
চীনে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৫৬ জন, আক্রান্তের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। তবে আক্রান্তের
চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার একটি বহুতল ভবনের জানালার কার্নিশ থেকে আটকা পড়া একটি বিড়ালকে উদ্ধার
আল কুরআন ডেস্কঃ মাত্র আট মাসে ৩০ পারা পবিত্র আল কোরআনের হাফেজ হয়েছে আট বছরের
এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র হচ্ছে চীন। এশিয়ার দীর্ঘতম জনবহুল শহর এটি। তবে এত জনসংখ্যা নিয়েও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo-orginal