, রোববার, ৫ জুলাই ২০২০

Avatar admin

মরণঘাতী ” করোনা ” পরিস্থিতিতে সোহেল ফখরুদ্দীনের মানবিক কর্মসুচী

প্রকাশ: ২০২০-০৬-০৪ ২০:০৯:০৮ || আপডেট: ২০২০-০৬-০৪ ২০:০৯:১০

Spread the love

মোঃ সাফাত বিন সানাউল্লাহঃ পবিত্র কোরানের সুরা বাকারায় আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ” যদি তোমরা দান-সদকাহ বা সাহায্য-সহযোগিতা প্রকাশ্যে কর তাও ভালো। আর যদি এমন কাজ গোপনে বা অপ্রকাশ্যে কর, তা আরো ভালো “। পবিত্র কোরানে আরো ইরশাদ হয়েছে, ” তোমাদের কাছে কোনো গরিব, অসহায়, এতিম-মিসকিন কিছু চাইলে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দিও না ” । হজরত মোহাম্মাদ [সা.] তাঁর সারা জীবনকে মানবতার সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। কেবল জাতি-ভাই কিংবা মুসলমানদের ব্যাপারে নয়, ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের সেবার ক্ষেত্রেও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তিনি ছিলেন মানবতার নবী। তিনি ছিলেন মানবসেবার মূর্তপ্রতীক। তাঁর অনুসারী হিসেবে মানবসেবার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যাপক ভূমিকা থাকা উচিত এবং এ ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা থাকাটাই মুসলমানিত্বের দাবি। মানবসেবা, মানবতার কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করাই ছিল মানবতার নবীর জীবনের মহান ব্রত। নবিজি [সা.] বলেছেন, ” তোমাদের মাঝে যারা তার প্রতিবেশীকে উপোস রেখে খাবার গ্রহণ করে, সে আমার অনুসারী নয় “। ইসলাম ও ইসলামের নবী এভাবেই মানবসেবাকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। একজন মুসলমান হিসেবে মানবকল্যাণমূলক কাজে জড়িত থাকা, মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা ঈমানি দায়িত্ব।যে ব্যক্তি মানুষকে দয়া করে না, আল্লাহ তায়ালা তাহার উপর রহমত বর্ষণ করে না – আল হাদীস।মানবসেবা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। মানবিকতা, মানবসেবা, মানবসম্পদ একে অন্যের সংশ্লিষ্ট বিষয়। এই ধারাতে যারা পরিপূর্ণ জীবন গঠন করতে পেরেছে ওরাই আসল মানুষ। মানবতার সেবায় যাদের জীবন উৎসর্গিত ওদের কাতারে ইতিহাসের পাতায় জলন্ত উদাহরণ হয়ে সমুজ্জ্বল প্রদীপের ন্যায় থাকবেন চট্টগ্রামেরই কৃতি সন্তান – ইতিহাসবেত্তা ও গ্রন্থ প্রণেতা সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দীন।চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন রাস্তাঘাটে করোনার মহামারীতে বিপর্যস্ত ছিন্নমূল পথশিশু ও ভবঘুরে বৃদ্ধ নর-নারীদের মাঝে দৈনিক ৬০ জন করে আজ ১ জুন ২০২০ পর্যন্ত ৪৭ দিন ধরে ৩৯২০ জনকে নিজ বাসায় রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি, ইতিহাস গবেষক, মানবতার ফেরিওয়ালা সোহেল মো. ফখরুদ-দীন। গত ১১ এপ্রিল ২০২০ থেকে শুরু করে প্রথমে সপ্তাহে ২ দিন, পরে প্রতিদিন রান্না করা খাবার বিতরণ করেন তিনি। করোনা মহামারীতে আক্রান্ত সমগ্র পৃথিবীর সাথে বাংলাদেশ ও চট্টগ্রামের মানুষ মহাবিপর্যয়ের মধ্যেই রয়েছে। এর মাঝে চট্টগ্রাম নগরীর পথে পথে পথশিশু ও বৃদ্ধ বয়স্ক ভবঘুরে নর-নারী রয়েছে মহাবিপদে। পথে পথে ছিন্নমূল পথশিশুগুলোর খাবারের অভাব ও ভবঘুরে মানুষগুলোর খাদ্য সংকট দেখা দেয়। কারণ সাধারণ মানুষ করোনার কারণে গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে, প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ী থেকে বের হচ্ছে না। তাই ভিক্ষুক শ্রেণির পথের মানুষ ও পথশিশুদের মহাবিপদ। কোথাও কোন খাবারের দোকান খোলা নেই, নেই কোন মসজিদের সামনে মুসল্লী, কিংবা মাজারের সম্মুখে জিয়ারতের মানুষ, মানুষের চলাফেরা না থাকায় ভিক্ষুক, পথশিশুরা খাবার পাচ্ছে না। সেই কারণে মানবিক একটি কর্মসূচি হাতে নিয়ে প্রাথমিকভাবে নিজ থেকে অর্থ দিয়ে এবং নিজের পরিবার থেকে রান্না করা খাবার বিতরণের জন্য উদ্যোগী হন ইতিহাসের মানুষ সোহেল মো. ফখরুদ-দীন। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন পথে পথে সীমিত সংখ্যক মানুষের হাতে খাদ্য পৌঁছে দিয়ে তিনি এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করছেন। তার মহৎ এই কর্মকাণ্ড ফেসবুকে প্রকাশিত হওয়ায় মানবিক এই কাজে হাত প্রসারিত করেন তাঁর দেশ বিদেশের বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয় – স্বজন এবং চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের কয়েকজন উপদেষ্টা। এই পর্যন্ত তিনি ৪৭ দিন ধরে এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে গিয়েছেন। প্রতিনিয়ত এই রান্না করা খাবারগুলো তাঁর বাসায় তৈরি করে এবং খাবারগুলো মানসম্মতভাবে প্যাকেট করে অভুক্ত মানুষের হাতে হাতে রোজার মাসে ইফতারের আগে পৌঁছে দেওয়া হতো। এখন দুপুরের খাবার হিসেবে বেলা দুটায় পৌঁছে দেওয়া হয়। সোহেল ফখরুদ-দীন নিজেই এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু গাজী মাওলানা রেজাউল করিম তালুকদার, অধ্যক্ষ মো. ইউনুস কুতুবী, মো. আবু বাক্কর, ইঞ্জিনিয়ার সৌমেন বড়ুয়া , ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, কাজী মো. আরফাত, সাজিদ মো.শরফুদ-দীন, মোহাম্মদ সাফায়েত উদ-দীন, এবিএম মাসুদ, প্রকাশ বড়ুয়া, মো. আলমগীর ইসলাম সহ আরো কয়েকজন প্রতিনিয়ত তাঁরা পথে পথে এই খাবারগুলো তুলে দিয়ে আসেন। মানবিক এই কর্মসূচিতে এই কাজগুলো করতে পেরে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং খুশি। এই বিষয়ে ইতিহাসবেত্তা সোহেল মো. ফখরুদ-দীন জানান, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ, পেশায় ইতিহাস লেখক, জীবনীকার, আলোকচিত্রশিল্পী ও পুস্তক প্রকাশক। লেখালেখির সাথে জড়িত, কিন্তু পৃথিবী থেমে থাকা এই অবস্থায় আমি গৃহে বসে থাকতে পারলাম না। মানবিক কর্মসুচী হাতে নিয়ে নিজের অর্থ এবং বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতা নিয়ে মানবিক এই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লাম। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রতিদিন এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া আমার ইচ্ছা রয়েছে।

আশা করবো বন্ধু স্বজন এই কর্মকাণ্ডে আন্তরিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখবেন। আমার মতো এরকম উদ্যোগ গ্রহণ করে আরো মানুষ মানবিক কাজে নেমে আসে, তাহলে সত্যিকার অর্থে সরকারের পাশাপাশি আমরা নিজেদের অবস্থানটুকু একদিন জাতির কাছে প্রমাণ করতে পারবো। আমরা মানুষ ছিলাম। মানবিক ছিলাম। মানুষ মানুষের জন্য, মানুষের জন্য আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। আসুন সকলে মিলে এই করোনার এই মহাবিপদের সময়ে বিশেষ করে পথে-প্রান্তরে যে সমস্ত ভবঘুরে এবং পথশিশু রয়েছে তাদেরকে আমরা নিজ উদ্যোগে একটু খাবার দিয়ে জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসি।

লেখকঃ মোঃ সাফাত বিন সানাউল্লাহ, প্রাবন্ধিক, ছড়াকার ও কবি। সদস্য, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র ( সিএইচআরসি) । তারিখঃ ৩ জুন ২০২০. মোবাইলঃ ০১৮১৯৩৬৯৪৭০

Logo-orginal