, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০

Avatar admin

মহেশখালীতে ৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে দূষণজনিত কারণে মারা যেতে পারে ৩০ হাজার মানুষ

প্রকাশ: ২০২০-০৯-২৪ ১৩:৪৮:০০ || আপডেট: ২০২০-০৯-২৪ ১৩:৪৮:০৩

Spread the love

জয়নাল আবেদীন, মহেশখালীঃ কক্সবাজারের মহেশখালীতে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবকটি নির্মিত হলে বায়ু দূষণজনিত বিভিন্ন রোগে মারা যেতে পারে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলোর জীবনকাল ৩০ বছরের মধ্যে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর এক যৌথ ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে গত মঙ্গলবার এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

গবেষণা সংস্থা সিআরইএ-এর প্রধান বিশ্লেষক লরি মিলিভিরতা বলেন, মহেশখালী ও মাতারবাড়ীতে প্রস্তাবিত ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবকটি নির্মাণ হলে এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ হাব। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রভাব নিরূপণ করায় চরম গাফিলতি করা হয়েছে এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিও খুব দুর্বল। লরি আরও বলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণ হতে পারে। যেমন, বায়ুতে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি বেড়ে গেছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ও সংলগ্ন এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়, প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাংলাদেশে কোভিড১৯-এর মতো মহামারি আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। দেশে বায়ু দূষণজনিত রোগে এমনিতেই বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাতাসে আরও বিষাক্ত পদার্থ মিশলে এ ধরনের মহামারিতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। ২০১৭ সালের গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডির তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বায়ু দূষণ ১১ শতাংশ ডায়াবেটিস, ১৬ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সার, ১৫ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, ইসকেমিক হৃদরোগে ১০ শতাংশ মৃত্যু এবং ৬ শতাংশ স্ট্রোকের জন্য দায়ী। বায়ুর মান, স্বাস্থ্য পরিবেশের ওপর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব” শীর্ষক এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে মাতারবাড়ী ও মহেশখালীতে প্রস্তাবিত ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর, যেগুলোর সমন্বিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮.৭ গিগাওয়াট। এগুলোর বিষাক্ত পদার্থ নির্গমন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা খুবই অপ্রতুল। যেমন, জাইকার অর্থায়নে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট (প্রথম পর্যায়) বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষাক্ত পদার্থ নির্গমনের সীমা চীন, ভারত বা ইউরোপিয় ইউনিয়নের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি। জাপান ও চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি বেশিরভাগ প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাতারবাড়ী-মহেশখালীতে প্রস্তাবিত ৮টি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র তাদের ৩০ বছরের জীবনকালে যে বিষাক্ত পদার্থ বাতাসে নিঃসরণ করবে, তা ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে। এর মধ্যে ৪১০০ জন দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, ৭০০০ জন হৃদরোগ, ২০০ শিশুসহ ২৯০০ জন ফুসফুসের প্রদাহ, ১৩০০ জন ফুসফুসের ক্যান্সার, ৬৪০০ জন স্ট্রোক এবং ২৪০০ জন নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় মারা যেতে পারে।

বায়ু দূষণে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম। বায়ুদূষণের ফলে বাংলাদেশের গড় আয়ু প্রায় ২ বছর কমেছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীর পরই বায়ু দূষণে ঢাকার অবস্থান। ঢাকার বায়ুতে ক্ষুদ্র দূষক পিএম ২.৫-এর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের ৮ গুণ এবং জাতীয় মানের চেয়ে ৬ গুণ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের লক হেভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমরা উন্নত দেশগুলোর দূষণের সমালোচনা করছি এবং ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের নেতৃত্ব দিচ্ছি। অথচ আমরাই যদি মাতারবাড়ী-মহেশখালীর মতো কয়লাবিদ্যুৎ হাব নির্মাণ করি, তাহলে অন্যদের সমালোচনা করার অধিকার আমাদের থাকবে না।

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাতাসে ১৬০০ কেজি পারদ এবং ৬০০০ টন ফ্লাই অ্যাশ নির্গমন করবে। এর মধ্যে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া পারদের মধ্যে ৪০ শতাংশ মাটি ও স্বাদুপানির জলাশয়ে জমা হবে এতে খাদ্যে পারদের পরিমাণ বাড়বে। কারণ, কক্সবাজার অঞ্চল সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি এবং চিংড়ি চাষের জন্য বিখ্যাত। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিষাক্ত পদার্থ নির্গমন হলে এখানকার মৎস্যশিল্প হুমকির মুখে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত পারদসহ অন্যান্য দূষক আমাদের প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি করবে যার ফলে খাদ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন অনিরাপদ হয়ে পড়বে। বিশেষত আমাদের উপকূলীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ মাছ এবং মৎস্যজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা যা বাধাগ্রস্ত হবে।

২০১৮ সালে কক্সবাজারে ৩৬,৮০০ টন সামুদ্রিক মাছ এবং ১২,৭৩৩ টন চিংড়ি উৎপাদন করা হয়। একই সময়ে এই অঞ্চলে ৩০০ কোটি টাকার (৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) শুঁটকি উৎপাদিত হয়। কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। এখানেই রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত ও ১১টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। কক্সবাজারের টেকনাফেই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির, যেখানে এখন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসবাস।

চলতি বছরের মে মাসে সিআরইএ এবং বাপা যৌথভাবে বাংলাদেশের পায়রায় প্রস্তাবিত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করেছিল।ওই গবেষণা অনুসারে, পায়রার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের ৩০ বছরের জীবনকালে ৩৪,০০০ মানুষের বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বাপা সহসভাপতি রাশেদা কে চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন বাপা সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল। সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ডা. রশিদ-ই-মাহবুব, সুন্দরবন রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ডাঃ মোহাঃ আব্দুল মতিন, বাপা কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রমুখ। -যমুনা

Logo-orginal