আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ফুটবল দলের ডাকনামের উৎস

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে ‘আলবিসেলেস্তে’ ও ‘সেলেসাও’ বলা হয় কেন, এলো কোথা থেকে?

বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল দুটি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে পরিচিত। মাঠের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি এই দলগুলোর নিজস্ব পরিচিতিও রয়েছে, যা তাদের ডাকনামের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ফুটবলপ্রেমীরা আর্জেন্টিনাকে ‘আলবিসেলেস্তে’ এবং ব্রাজিলকে ‘সেলেসাও’ নামে ডাকতে অভ্যস্ত। ধারাভাষ্য, সংবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এই নাম দুটি নিয়মিত শোনা যায়। এই ডাকনামগুলোর উৎপত্তি এবং এর পেছনের ইতিহাস বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

আর্জেন্টিনার ‘আলবিসেলেস্তে’ নামের ইতিহাস

‘আলবিসেলেস্তে’ (La Albiceleste) শব্দটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে এসেছে এবং এটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘Albi’ শব্দের অর্থ সাদা এবং ‘Celeste’ শব্দের অর্থ আকাশি নীল। অর্থাৎ, ‘আলবিসেলেস্তে’ বলতে ‘সাদা-আকাশি নীল’ বোঝায়। এই নামটি আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় দলের জার্সির রঙের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর্জেন্টিনার পতাকায় দুটি আকাশি নীল এবং একটি সাদা অনুভূমিক রেখা রয়েছে। এই একই রঙের আদলে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ডোরাকাটা জার্সি ১৯০৮ সাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এরপর থেকেই দলটি ‘লা আলবিসেলেস্তে’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

‘আলবিসেলেস্তে’ এখন শুধু একটি ডাকনাম নয়, এটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্য, জাতীয় গর্ব এবং পরিচয়ের প্রতীক। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আকাশি-সাদা জার্সির উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এতটাই চোখে পড়েছে যে তারাও দলটিকে ‘আলবিসেলেস্তে’ নামেই উল্লেখ করেছে।

আর্জেন্টিনার এই নীল-সাদা জার্সির পেছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। লিওনেল মেসি, দিয়েগো মারাদোনা এবং মারিও কেম্পেসের মতো কিংবদন্তি খেলোয়াড়রা এই জার্সিতেই বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলেছেন। জার্সির মাঝে থাকা সূর্যের লোগোটি আর্জেন্টিনার পতাকার মতোই, যা ইনকা দেবতা সূর্যের প্রতীক। এই জার্সির গল্প জানতে হলে উনিশ শতকের স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার মুক্তির লড়াইয়ের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। স্প্যানিশ রয়্যাল বাহিনীর রঙ ছিল সাদা-লাল-সোনালি, তাই আর্জেন্টিনার নিজস্ব পরিচয়ের জন্য একটি নতুন পতাকার প্রয়োজন ছিল।

১৮১২ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী ম্যানুয়েল বেলগ্রানো প্রথম যুদ্ধ পতাকা হিসেবে নীল-সাদা পতাকার আত্মপ্রকাশ ঘটান। বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আর্জেন্টিনা স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি পায়। এই নীল-সাদা পতাকা প্রথম ওড়ানো হয়েছিল রোসারিও শহরের পারানিয়া নদীর ধারে। বেলগ্রানো কেন নীল-সাদা রঙ বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন, এটি মুক্ত আকাশের নীল এবং মেঘের সাদা প্রতীক। আবার কেউ বলেন, এটি মাতা মেরির শালের নীল-সাদা রঙ থেকে অনুপ্রাণিত। ১৮১৮ সালে ৩২টি রশ্মিওয়ালা সূর্যের ছবি যুক্ত হয়, যা ইনকা দেবতা সূর্যের প্রতীক। এভাবেই নীল-সাদা আর্জেন্টিনার পতাকায় পরিণত হয়।

হাজার বছরের ধর্মচর্চা, আর্জেন্টিনার জার্সি নীল-সাদার নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস!
হাজার বছরের ধর্মচর্চা, আর্জেন্টিনার জার্সি নীল-সাদার নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস! Credit: sangbadpratidin.in

তবে শুরুতে ফুটবল দলের জার্সিতে এমন নীল-সাদা স্ট্রাইপ ছিল না। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের আগমন ঘটে ব্রিটিশদের হাত ধরে। উনিশ শতকের শেষ দিকে ফুটবল ফেডারেশন গঠিত হয়। ১৯০১ সালে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলের জার্সির রঙ ছিল পুরো আকাশি, যা অনেকটা উরুগুয়ের জার্সির মতোই ছিল। এরপর ১৯০৮ সালে সাও পাওলোতে ব্রাজিলের একটি ফুটবল ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রথম নীল-সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া জার্সি পরে খেলে আর্জেন্টিনা। সেই থেকে এই ঐতিহাসিক যাত্রা চলে আসছে।

আর্জেন্টিনার শুধু নীল-সাদা জার্সিই নয়, গাঢ় নীল রঙের আরও একটি জার্সি রয়েছে। এই জার্সিটি ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসিদের হৃদয়ভঙ্গের সাক্ষী হয়েছে, আবার ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মারাদোনার অবিস্মরণীয় গোলেরও সাক্ষী। এই জার্সির জন্ম ছিল নিতান্তই একটি দুর্ঘটনা। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ হয়েছিল মেক্সিকোতে। প্রবল গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নীল-সাদা ‘হোম’ জার্সিটি বিশেষভাবে বানানো হয়েছিল, কিন্তু অ্যাওয়ে জার্সির দিকে ততটা মনোযোগ দেওয়া হয়নি। গ্রুপ পর্বে মারাদোনারা নীল-সাদা জার্সিতেই খেলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রবল বৃষ্টিতে অ্যাওয়ে জার্সি ভারী হয়ে যায়। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে নতুন জার্সির খোঁজ শুরু হয়।

প্রথমে জার্সি প্রস্তুতকারক সংস্থাকে জানানো হলে তারা এত তাড়াতাড়ি নতুন জার্সি বানানো সম্ভব নয় বলে জানায়। তখন দলের দুই কর্মকর্তা বাজারের দিকে রওনা দেন এবং একটি দোকান থেকে দুটি নীল জার্সি বেছে নিয়ে আসেন। জার্সিগুলোতে কোনো নম্বর বা লোগো ছিল না। কোচ কার্লোস বিলার্দোর কোনো জার্সিই পছন্দ হয়নি। সেই সময় মারাদোনা দুটি জার্সির মধ্যে একটি বেছে নিয়ে বলেন, “এই জার্সিটা দেখতে খুব সুন্দর। এটা পরেই আমরা ইংল্যান্ডকে হারাব।” এরপর ৩৮টি জার্সি কিনে আনা হয় এবং দ্রুত আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের লোগো হাতে সেলাই করে বসানো হয়। জার্সি নম্বর বসানো হয় আমেরিকার ফুটবল জার্সির আদলে। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন, সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে মারাদোনা ‘হ্যান্ড অফ গড’ এবং বিখ্যাত গোলটি করেন। সেবার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপও জেতে। ২০২২ সালে লিওনেল মেসির হাতে বহুপ্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ওঠে, এবং সেই জার্সিও এখন আইকনিক হয়ে উঠেছে।

ব্রাজিলের ‘সেলেসাও’ নামের উৎপত্তি

ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের বহুল ব্যবহৃত ডাকনাম ‘A Seleção’, যা পর্তুগিজ ভাষার শব্দ। এর অর্থ ‘নির্বাচিত দল’ বা ‘জাতীয় দল’। পর্তুগিজ ভাষায় ‘সেলেসাও’ শব্দটি সাধারণত জাতীয় প্রতিনিধিত্বকারী দল বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, ব্রাজিলে এটি বিশেষভাবে জাতীয় ফুটবল দলের সমার্থক হয়ে গেছে। দেশটির ফুটবল ইতিহাস, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা এবং অসংখ্য সাফল্যের কারণে ‘সেলেসাও’ বললেই সবাই ব্রাজিলকে বোঝে।

তবে ব্রাজিলের আরও কয়েকটি জনপ্রিয় ডাকনাম রয়েছে। এর মধ্যে ‘কানারিনহো’ (ছোট ক্যানারি পাখি) সবচেয়ে পরিচিত, যা তাদের হলুদ জার্সির কারণে প্রচলিত হয়েছে। এছাড়া ‘ভার্দে আমারেয়া’ (সবুজ-হলুদ) নামটিও ব্যবহৃত হয়, যা ব্রাজিলের জাতীয় পতাকার রঙের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই নামগুলো শুধু পরিচয়ের জন্য নয়, বরং সেই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগেরও প্রতিফলন।

বিশ্ব ফুটবলে জাতীয় দলের ডাকনামগুলো কেবল একটি পরিচয় নয়, বরং সেই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আবেগের প্রতীক। যেমন ইতালিকে বলা হয় ‘আজ্জুরি’, ফ্রান্সকে ‘লে ব্লু’, উরুগুয়েকে ‘লা সেলেস্তে’ এবং স্পেনকে ‘লা রোহা’। একইভাবে আর্জেন্টিনার ‘আলবিসেলেস্তে’ এবং ব্রাজিলের ‘সেলেসাও’ নাম দুটি আজ বিশ্ব ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুদেশের সমর্থকদের কাছে এই নামগুলো কেবল একটি ডাকনাম নয়, বরং শত বছরের ফুটবল ঐতিহ্য, গৌরব ও আবেগের প্রতীক। তাই মাঠে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের লড়াই যতটা রোমাঞ্চকর, ‘আলবিসেলেস্তে’‘সেলেসাও’ নাম দুটিও ততটাই ইতিহাসসমৃদ্ধ এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত ব্র্যান্ড।

Read Also

Source: jugantor.com