আটলান্টায় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা

৭৫ মিনিটের পর ১১ গোল: আর্জেন্টিনা যেন ঘুরে দাঁড়ানোর অন্য নাম

আর্জেন্টিনার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন

আর্জেন্টিনা সম্প্রতি ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছে। এই জয়ের ফলে তারা ২০২২ সালের শিরোপা ধরে রাখার সুযোগ পাচ্ছে। ম্যাচটি আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর শেষ বাঁশি বাজার পর রেকর্ড বইয়ে নতুন একটি পাতা যুক্ত হয়।

৫৫ মিনিটে ইংলিশ ফরোয়ার্ড অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে গিয়েছিল। এরপর ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ সমতাসূচক গোল করেন এবং যোগ করা সময়ের (৯০+২) দ্বিতীয় মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের গোলে আর্জেন্টিনা জয় নিশ্চিত করে। এই জয় কোপা আমেরিকা জয়ী আর্জেন্টিনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

৭ মিনিটের পাগলামিতে আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা
৭ মিনিটের পাগলামিতে আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা Credit: jugantor.com

ম্যাচের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলেন, তাই এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্প্যানিশ ভাষার দুটি দলের মধ্যে দ্বিতীয় ফাইনাল হবে। এর আগে ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসরে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ইংল্যান্ডের কৌশলগত ভুল

৫৫ মিনিটে গর্ডনের গোলের পর ফার্নান্দেজের সমতাসূচক গোলের মাঝে ৩১ মিনিটে ইংল্যান্ডের বলের দখল ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। অ্যাটাকিং থার্ডে তারা মাত্র ৯ বার বল ছুঁতে পেরেছে, যা তাদের প্রতিপক্ষের চেয়ে ১৬৫ বার কম। ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষেও এগিয়ে থেকে খেলোয়াড়দের রক্ষণভাগে নেমে এসে চাপ সামলানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয়ার্ধে ‘হাইড্রেশন ব্রেকের’ পর ইংল্যান্ড কৌশল পরিবর্তন করে রক্ষণাত্মক ৫-৪-১ ফরমেশনে খেলতে শুরু করে। এতে তারা আর্জেন্টিনাকে আক্রমণের সুযোগ করে দেয় এবং আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে ম্যাচের ভাগ্য নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। এই অতিরক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে ইংল্যান্ডের তারকা হ্যারি কেইনও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “ম্যাচের সিংহভাগ সময় আমরা ভালো খেলেছি। কিন্তু ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছে আমরা শুধু লিডটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। এই পর্যায়ের ফুটবলে শুধু এতটুকু দিয়ে পার পাওয়া যায় না।”

কেইন আরও উল্লেখ করেন, “গোল করে তারা আক্রমণভাগে খেলোয়াড় বাড়িয়েছে, নাকি আমরাই তাদের ম্যান-মার্কিংয়ে টেক্কা দিতে পারিনি—সেটা জানি না। তবে একের পর এক আক্রমণের ঢেউ ঠেকিয়ে আমরা কেবল লিড ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা যথেষ্ট ছিল না।”

আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্যে

আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর মূল ভূমিকা পালন করেন লিওনেল মেসি। ইংল্যান্ড রক্ষণভাগে পুরোপুরি গুটিয়ে থাকায় বক্সের বাইরে বলের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পান মেসি। ডান প্রান্ত দিয়ে কখনো ক্রস, কখনো বক্সে ঢুকে বেশ বিপজ্জনক কিছু পাস দেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। শুধু মেসিই নন, বদলি নামা রদ্রিগো দি পলের ক্রস থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসাটা ছিল ইংল্যান্ডের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

বক্সের বাইরে থেকে ফার্নান্দেজের শটটি ছিল দুর্দান্ত, যা সমতাসূচক গোল এনে দেয়। এরপর মেসির জাদুকরি মুহূর্তে তার দুর্বল ডান পা দিয়ে দূরের পোস্টে নিখুঁত ক্রস থেকে জয়সূচক গোলটি করেন মার্তিনেজ। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জন্য শেষ মুহূর্তে গোল করা নতুন কিছু নয়। ম্যাচে ৭৫ মিনিট পার করে চলতি টুর্নামেন্টে এটি ছিল আর্জেন্টিনার ১১তম গোল।

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল শারীরিক ফুটবল খেলেছে। দ্বিতীয় মিনিটেই লিয়ান্দ্রো পারেদেস জুড বেলিংহামকে ধাক্কা দেন। প্রথমার্ধ গোলশূন্য অবস্থায় শেষ হয়, তবে কার্ডের হিসাবে দুই দলই সমান ছিল। এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে গোল পায়নি, এর আগে মিশর ম্যাচ ছাড়া প্রতিটি ম্যাচেই তারা প্রথমার্ধে গোল করেছিল।

১৯ মিনিটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ প্রথম সেভ করেন। মরগান রজার্সের একটি ক্রস বক্সে ঠিকভাবে ধরতে পারেননি তিনি, তবে বিপদ হতে দেননি। ৩৫ মিনিটে এলিয়ট অ্যান্ডারসন মেসিকে ফাউল করার জন্য প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন। এর কিছুক্ষণ পরই লিসান্দ্রো মার্তিনেজও হলুদ কার্ড দেখেন জেড স্পেন্সকে আটকাতে গিয়ে জার্সি টেনে ধরার জন্য।

৫৫ মিনিটে মরগান রজার্সের ক্রস থেকে অ্যান্থনি গর্ডন গোল করার পর ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোও হলুদ কার্ড দেখেন বেলিংহামকে ফাউল করে। এতে দুই সেন্টারব্যাকই লাল কার্ডের শঙ্কায় পড়ে যান। খেলা যখন শেষের দিকে, তখন একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে আর্জেন্টিনা। মেসির ক্রস থেকে নিকো গনসালেসের হেড ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। এক মিনিট পরই আরেকটি হেড রুখে দেন তিনি। তবে ৮৬ মিনিটে আর ঠেকাতে পারেননি।

রেফারি ৯ মিনিট বাড়তি সময় দিয়েছিলেন। সেই সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মেসির দারুণ এক ক্রসে হেড করেন লাউতারো মার্তিনেজ। বল ইংল্যান্ডের জালে জড়িয়ে যায়। এই গোলেই আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। ফাইনাল নিশ্চিত করার পর স্পেন এর মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।

Read Also

Source: prothomalo.com