ফ্রান্সের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ভিন্ন লক্ষ্য

দেশম যুগের শেষে জিদানের হাতে নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায় ফ্রান্স

ফ্রান্সের বিশ্বকাপ অভিযান

ফ্রান্স টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে তাদের শিরোপা জয়ের আশা শেষ হয়েছে। এই পরাজয় কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং এটি দিদিয়ের দেশমের ১৪ বছরের দীর্ঘ কোচিং অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে পারে। এখন ফরাসি ফুটবল একটি নতুন যুগের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান নেতৃত্বে আসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের হার ছিল হতাশাজনক। কিলিয়ান এমবাপের দল টানা ছয় জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামলেও প্রতিপক্ষের সামনে বলের নিয়ন্ত্রণ, কৌশল বা আক্রমণে আধিপত্য দেখাতে পারেনি। এটি টানা তৃতীয়বারের মতো স্পেনের কাছে বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের হার। এর আগে ইউরো ২০২৪ এবং নেশন্স লিগেও একই প্রতিপক্ষের কাছে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল।

ম্যাচ শেষে এমবাপে স্বীকার করেছেন যে দল তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারেনি। তিনি বলেন, কৌশলগত ও কারিগরি উভয় দিক থেকেই তারা কাঙ্ক্ষিত ম্যাচটি খেলতে পারেননি এবং বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারলে জেতা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা রায়ান চেরকিও রেফারির বা প্রতিপক্ষের ওপর দোষ চাপাননি, বরং বলেছেন যে তারা নিজেদের কাছেই হেরেছেন।

দেশমের বিদায় এবং নতুন অধ্যায়

এই হারের মধ্য দিয়েই দিদিয়ের দেশমের প্রায় ১৪ বছরের সফল অধ্যায় শেষ হতে চলেছে। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ফ্রান্সের ফুটবল ২০১০ বিশ্বকাপের বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার ধাক্কায় বিধ্বস্ত ছিল। সেই দলকেই তিনি বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত করেছিলেন। তার অধীনে ফ্রান্স ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতেছে এবং ২০২২ সালে ফাইনাল খেলেছে। শৃঙ্খলা, ভারসাম্য এবং টুর্নামেন্টভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি ধারাবাহিক সাফল্য এনে দিয়েছেন।

যদিও দেশমের অধীনে ফ্রান্স ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে পরাজিত হয়েছিল, ফিফাউয়েফার নিয়ম অনুযায়ী শুটআউটের হারকে আনুষ্ঠানিক পরাজয় হিসেবে ধরা হয় না। তাই সেই ম্যাচটি দেশমের হার হিসেবে পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশ্বকাপে দেশমের অধীনে ফ্রান্স মোট ২৬টি ম্যাচ খেলেছে। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তার সামগ্রিক পরিসংখ্যান ১৮৪ ম্যাচে ১২০ জয়, ৩৫ ড্র এবং ২৯ হার।

দেশমের বিদায়ের পর দায়িত্ব নেওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে জিনেদিন জিদানকে দেখা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও সাবেক ফরাসি অধিনায়ক এবং রিয়াল মাদ্রিদের সফল কোচকেই দেশমের স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার মতো অসাধারণ ফুটবলারদের নিয়ে একটি কার্যকর দল গড়ে তোলা।

এই বিশ্বকাপে ওলিসের উত্থান এবং আক্রমণভাগের কিছু ইতিবাচক দিক জিদানকে আশাবাদী করতে পারে। তবে স্পেনের বিপক্ষে অসহায় আত্মসমর্পণ এটাও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, সম্ভাবনাকে সাফল্যে রূপ দিতে এখনও অনেক কাজ বাকি।

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের গুরুত্ব

ফ্রান্সের বিশ্বকাপ অভিযান এখানেই থেমে যাচ্ছে না। টুর্নামেন্ট শেষ করার আগে তাদের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হবে। আগামী শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ফরাসিরা মাঠে নামবে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আর্জেন্টিনাইংল্যান্ডের মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে পরাজিত দল। এই ম্যাচটি আজ বুধবার দিবাগত রাত ১টায় আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।

ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও ফ্রান্স জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করতে চায়। বিশেষ করে কোচ দিদিয়ের দেশমের ভবিষ্যৎ নিয়ে জোর গুঞ্জন থাকায় ম্যাচটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই বিশ্বকাপের পর ফরাসি দলের দায়িত্ব ছাড়তে পারেন দেশম। তাই বিদায়ের আগে একটি জয় দিয়ে নিজের অধ্যায়ের ইতি টানতে চাইবেন তিনি।

ফ্রান্সের জন্য ম্যাচটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলবে ‘লে ব্লু’রা। যদিও অনেকের কাছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের গুরুত্ব তুলনামূলক কম, বাস্তবে এটি আর্থিক ও ক্রীড়াগত—দুই দিক থেকেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল পাবে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার, আর চতুর্থ হওয়া দল পাবে ২৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, একটি ম্যাচের ফলেই তৈরি হবে ২০ লাখ ডলারের পার্থক্য।

শুধু অর্থই নয়, ম্যাচটির ফল ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও প্রভাব ফেলবে। নকআউট পর্বে জয় পেলে অতিরিক্ত রেটিং পয়েন্ট যোগ হয়, যা ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্টে সিডিং ও ড্রয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমবাপের বয়স এখন ২৭। সামনে ইউরো ২০২৮ এবং ২০৩০ বিশ্বকাপ রয়েছে। মিয়ামিতে জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপের তৃতীয় সেরা দল হিসেবে টুর্নামেন্ট শেষ করতে চাইবে ফ্রান্স

Read Also

Source: bangla.thedailystar.net