আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে দর্শক রেকর্ড
লিওনেল মেসির নেতৃত্বে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয় শুধু মাঠেই উত্তেজনা ছড়ায়নি, টেলিভিশনের পর্দাতেও নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ইংরেজি ভাষার সম্প্রচারের ইতিহাসে এই সেমিফাইনালটি সবচেয়ে বেশি দর্শক দেখেছে। ফক্স স্পোর্টসের সম্প্রচারে ম্যাচটি গড়ে ১ কোটি ৫০ লাখ ৬৩ হাজার দর্শক দেখেছেন, যা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংরেজি ভাষার সম্প্রচারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দর্শকসংখ্যা।
এর মাত্র একদিন আগেই স্পেন–ফ্রান্স সেমিফাইনাল ১ কোটি ১৪ লাখ ৬২ হাজার দর্শক নিয়ে একটি নতুন রেকর্ড গড়েছিল। তবে মেসি এবং হ্যারি কেইনদের লড়াই সেই রেকর্ড মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভেঙে দিয়েছে। ম্যাচ চলাকালীন সময়ে দর্শকসংখ্যা সর্বোচ্চ ২ কোটি ২১ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছায়।
তুলনামূলকভাবে, কাতার বিশ্বকাপের ২০২২ আসরের দুটি সেমিফাইনালে ফক্সের গড় দর্শকসংখ্যা ছিল ৬৫ লাখ ৩১ হাজার। সেই আসরে ফ্রান্স–মরক্কো সেমিফাইনাল ৬৫ লাখ ৯৫ হাজার দর্শক নিয়ে এতদিন ইংরেজি ভাষার সম্প্রচারে সর্বোচ্চ রেটিংয়ের রেকর্ড ধরে রেখেছিল।
যুক্তরাজ্যেও ব্যাপক সাড়া
যুক্তরাজ্যেও আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। রেডিও টাইমস জানিয়েছে, বিবিসি ওয়ান ও বিবিসি আইপ্লেয়ারে সম্প্রচারিত ম্যাচটি দেশটিতে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বেশি দর্শক দেখা সরাসরি টেলিভিশন অনুষ্ঠান। সেখানে ম্যাচটি গড়ে ২ কোটি ২১ লাখ দর্শক দেখেছেন। একপর্যায়ে দর্শকসংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা সে সময় টেলিভিশন দেখছিলেন এমন মোট দর্শকের ৮৫ শতাংশ।
এটি চলতি বিশ্বকাপে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা ম্যাচও। এর আগে ইংল্যান্ড–নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল সর্বোচ্চ ১ কোটি ৬৮ লাখ দর্শক টেনেছিল। এছাড়া ২০২১ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ইতালির কাছে ইংল্যান্ডের হারের পর এটিই বিবিসির সবচেয়ে বড় সরাসরি সম্প্রচার দর্শকসংখ্যা।
আর্জেন্টিনার এই ঐতিহাসিক জয়ের পর, দলের সাবেক সতীর্থদের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন কিংবদন্তি উইঙ্গার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো দলকে অভিনন্দন জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নিজের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ডি মারিয়া লিখেছেন, “আমরা আর কিছুই চাইতে পারি না। ফুটবল এবং আর্জেন্টিনার মানুষের জন্য তোমরা যা করেছ, তার জন্য সারা জীবন শুধু কৃতজ্ঞ থাকব। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে আমরা গৌরব, আবেগ আর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো উপভোগ করছি। আর সবই সম্ভব হয়েছে তোমাদের কারণে।”
ডি মারিয়ার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত
অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকবেন না। তিনি এই সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত কুসংস্কারের কারণে নিয়েছেন। আর্জেন্টিনার অভিনেতা নিকো ভাসকেজ অভিনীত নাটক রকি দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, তিনি অপয়া হতে চান না এবং বাড়িতে বসেই ম্যাচ দেখবেন।

যদিও মাঠে উপস্থিত থাকছেন না, তবু হৃদয় দিয়ে দলের পাশেই আছেন বলে জানিয়েছেন রোজারিওর এই তারকা। তিনি বলেন, “ছেলেরা জানে, প্রথম দিন থেকেই আমি তাদের সমর্থন করে আসছি। এবারও সবসময়ের মতো দূর থেকেই তাদের সমর্থন করব।” আর্জেন্টিনার বর্তমান দল নিয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ডি মারিয়া। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি সঠিক বলেই মনে করেন।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি খুবই খুশি, ভীষণ আনন্দিত। আমি মনে করি, সরে দাঁড়িয়ে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল। ছেলেরা আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছে। গতকালের পারফরম্যান্সের পর তাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়া যায় না।” ডি মারিয়া যুক্তরাষ্ট্রে না যাওয়ায়, সম্ভাব্য বিশ্বকাপ ট্রফি উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মারিও আলবার্তো কেম্পেস অথবা অস্কার রুগেরি। কেম্পেস ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ে এবং রুগেরি ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি কিংবদন্তি কার্লোস বিলার্দোর পর দ্বিতীয় আর্জেন্টাইন কোচ হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে দলকে তুলেছেন। এর আগে বিলার্দোর অধীনে আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে টানা দুইবার ফাইনাল খেলেছিল। বর্তমান আর্জেন্টিনা দলকে প্রশংসায় ভাসিয়ে ডি মারিয়া আরও লেখেন, “এটি এমন এক প্রজন্ম, যারা জাতীয় দলের জার্সি পরার মর্যাদা বুঝেছে। বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়ানো চাপের কাছে তারা কখনো মাথা নত করেনি। আমি শুধু বলতে চাই, আরেকটি ফাইনাল উপহার দেওয়ার জন্য এবং আর্জেন্টিনার মানুষের জন্য তোমরা যা করছ, তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।”
২০২১ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দারুণ আধিপত্য দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা। দলটি ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফিনালিসিমা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এই চারটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালেই শিরোপা জিতেছে। এই সাফল্যের প্রতিটি অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার। বড় ম্যাচে গোল করা, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পেনাল্টি আদায় এবং আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনার অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারানোর ম্যাচটিই ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে ডি মারিয়ার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১৬ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে দেশের হয়ে সম্ভাব্য সব বড় শিরোপা জিতে জাতীয় দলকে বিদায় জানান এই কিংবদন্তি উইঙ্গার। বিশ্বকাপের ফাইনালে আগামী রোববার বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। তার আগে শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স।
Read Also
Source: bangla.thedailystar.net