আর্জেন্টিনা দলের ভবিষ্যৎ এবং স্কালোনির কোচিং নিয়ে আলোচনা

আর্জেন্টিনা দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা জানা গেল

টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির সাম্প্রতিক মন্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, আলবিসেলেস্তে স্কোয়াডে বড় ধরনের রদবদল আসতে পারে। এর ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপ-এর পর আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ দল কেমন হবে, তা নিয়ে ফুটবল মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন লিওনেল মেসিকে ঘিরে। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আর্জেন্টাইন অধিনায়ক জাতীয় দলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। অন্যদিকে, অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি আগেই জানিয়েছেন যে, এই বিশ্বকাপই জাতীয় দলের হয়ে তার শেষ অফিসিয়াল টুর্নামেন্ট।

গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন। তিনি পুরো বিশ্বকাপ ডান হাতে চোট নিয়ে খেলেছেন। ফাইনালের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে কি না, তা নিয়ে তিনি বিবেচনা করবেন।

এছাড়াও, রদ্রিগো ডি পল, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, নিকোলাস তালিয়াফিকো, নিকো গনসালেস এবং জিওভানি লো সেলসোদের ভবিষ্যৎ তাদের ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

নতুন প্রজন্মের আগমন

মেসিওতামেন্দিদের সম্ভাব্য বিদায়ের মধ্যেও আর্জেন্টিনা শিবিরে স্বস্তির খবর রয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী একদল পরিণত ফুটবলার ইতিমধ্যেই দলের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছেন। আগামী বিশ্বকাপ চক্রে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লাউতারো মার্টিনেজ, থিয়াগো আলমাদা এবং এজেকিয়েল প্যালাসিওস

একই সাথে ভবিষ্যতের স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন ভ্যালেন্তিন বারকো, নিকো পাজ, জুলিয়ানো সিমিওনে এবং হোসে ম্যানুয়েল লোপেসের মতো তরুণরা। এছাড়াও, লিও বালের্দি, মার্কোস সেনেসি, নিকোলাস কাপালদো, মাতিয়াস সুলে, আগুস্তিন গিয়াই এবং গোলরক্ষক সান্তিয়াগো বেলত্রানফাকুন্দো ক্যাম্বেসেসও ধীরে ধীরে জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছেন।

অভিজ্ঞদের বিদায় এবং তরুণদের উত্থান—এই দুইয়ের সমন্বয়ে আর্জেন্টিনা একটি নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

স্কালোনির কৌশল ও ভবিষ্যৎ

বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্কালোনি নিজেও ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষে দলের দায়িত্বে থাকবেন কি না, তা নিয়ে তিনি চিন্তা করবেন।

ফাইনালের একাদশ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কেন আগের ম্যাচের একাদশ থেকে লিয়ান্দ্রো পারেদেসজুলিয়ানো সিমিওনেকে সরিয়ে নিকো গঞ্জালেজরদ্রিগো দি পলকে নামানো হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দি পল আগের বিশ্বকাপে দলের অন্যতম ভরসা হলেও এবার নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন।

কোয়ার্টার ফাইনালসেমিফাইনালে গোল পাওয়া লাওতারো মার্তিনেজকে কেন মাঠে নামানো হলো না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। লাওতারো আগের দুই ম্যাচেই হেডে তার সামর্থ্য এবং প্রেসিংয়ের দক্ষতা দেখিয়েছিলেন।

এই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে এমন কয়েকজন খেলোয়াড় ছিলেন, যারা নিজেদের সেরা ফর্মে থেকেই বিশ্বকাপে এসেছিলেন। সিরি আ-তে একটি স্বপ্নের মৌসুম কাটিয়ে এসেছিলেন নিকো পাজ, যিনি কোমোকে চ্যাম্পিয়নস লিগে তুলতে বড় অবদান রেখেছেন। তিনি সিরি আ-এর সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন এবং ১২ গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন।

নিকো পাজ পুরো বিশ্বকাপে মাত্র ৭২ মিনিট খেলেছেন, যার মধ্যে ৬১ মিনিটই ছিল জর্ডানের গুরুত্বহীন ম্যাচে। অন্যদিকে, ফ্রেঞ্চ লিগে আলো ছড়ানো ভ্যালেন্টিন বার্কোও তেমন সুযোগ পাননি, অথচ তিনি একাধিক পজিশনে খেলতে পারেন।

স্কালোনি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর দলে পরিবর্তন এনেছিলেন এবং সে সময়ের তরুণ এনজো ফার্নান্দেজহুলিয়ান আলভারেজকে সুযোগ দিয়েছিলেন। চার বছর পরও স্কালোনি সেই দলের ওপরই আস্থা রাখতে চেয়েছিলেন।

অ্যাস্টন ভিলার ইউরোপা লিগজয়ী এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মতো ইনফর্ম খেলোয়াড়কে স্কালোনি দলেই রাখেননি। এই স্কোয়াড যখন মধ্যমাঠে সমস্যায় ভুগছিল, তখন লে চেলসোর মতো অভিজ্ঞ কেউও ভরসা হতে পারতেন। কিন্তু স্কালোনি তার চেনা ছক থেকে সরেননি। নকআউট পর্বে প্রায় প্রতি ম্যাচেই নিষ্প্রভ মধ্যমাঠকে বদলানোর কথা কেন স্কালোনি ভাবলেন না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বল দখলে না রাখলে কাউন্টার অ্যাটাক-ভিত্তিক দ্রুত ট্রানজিশন ফুটবলে যেতে হয়। কিন্তু আর্জেন্টিনা না বল দখলে রাখতে পেরেছে, না দ্রুত ট্রানজিশনে যেতে পেরেছে। স্পেনের অর্ধে গিয়ে পুরো দল মাত্র ৩৭টি বলে টাচ করতে পেরেছে।

আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি তার নিজ শহর পুজাতোতে সংবর্ধনা নিতে গিয়ে আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস-এর বরাতে স্কালোনি বলেন, ‘আমরা জিততে পারিনি। আমরা জানি, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতেই আমরা খেলি। আর সে কারণেই এই কষ্টটা এত বড়।’

ফাইনালের পরদিন বুয়েনস আইরেসে ফেরেন স্কালোনি। বুধবার সান্তা ফে প্রদেশের নিজ শহর পুজাতোতে পৌঁছালে শত শত সমর্থক তাকে সংবর্ধনা জানান। ৪৮ বছর বয়সী এই কোচ বলেন, ‘কখনও আপনি জিতবেন, কখনও হারবেন। আমাদের মেনে নিতে হবে, স্পেন আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করাও আমাদের আরও ভালো হতে সাহায্য করবে।’

২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো এবং টানা দ্বিতীয়বার দলকে ফাইনালে তোলা স্কালোনি মনে করেন, শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়াই তার দলের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুভূতি সব সময় একই থাকে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলেও আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করি। আর্জেন্টিনার মানুষকে বুঝতে হবে, প্রতিপক্ষও খেলতে নামে এবং কখনও তারা আপনার চেয়ে ভালো হতে পারে। তবু আমরা তাদের জন্য কাজটা কঠিন করে তুলেছিলাম।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সমর্থকেরা বারবার স্লোগান দেন, ‘লিও, তুমি যেও না!’ স্কালোনি সমর্থকদের স্লোগানের জবাবে বলেন, ‘আমি ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকছি, এরপরও আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’

আর্জেন্টিনা দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা জানা গেল
ছবি: সংগৃহীত Credit: rtvonline.com

এই বক্তব্যে আপাতত আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও, ডিসেম্বরের পর স্কালোনির ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।

Read Also

Source: rtvonline.com