, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২০

Avatar admin

চমেকে যত ভোগান্তি রোগীদের” নজরদারী দুদকের

প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৯ ০৯:৪৪:৪৫ || আপডেট: ২০১৯-১২-০৯ ০৯:৪৪:৪৫

Spread the love

(ছবি, সংগৃহীত)
চট্টগ্রাম অঞ্চলের গরিব ও অসহায় রোগীদের কম টাকায় চিকিৎসা সেবা পাওয়ার একমাত্র ভরসার স্থান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। এ অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের কাছে হাসপাতালটি গরিবের হাসপাতাল হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু এখানে চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয় নানা ভোগান্তি আর হয়রানিতে। আয়া-ওয়ার্ডবয়দের খারাপ ব্যবহার, টাকা ছাড়া বেড, হুইলচেয়ার ও ট্রলি না পাওয়া, দালালদের দৌরাত্ম্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাড়তি টাকা আদায়, বিনামূল্যের ওষুধ না পাওয়া, আনসারদের হয়রানিসহ নানা অভিযোগ এখন নিত্যদিনের। এসবের কারণে স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন না রোগী ও স্বজনরা। দেরিতে হলেও হাসপাতালের নানা অব্যবস্থাপনার বিষয়ে নজর এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। হাসপাতালের গেটম্যান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদের নজরদারিতে রেখেছে সংস্থাটি। রোগী-স্বজনদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করাদের ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

চমেকের হালচাল নিয়ে চট্টগ্রামের সাংবাদিক শৈবাল আচার্যের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক সমকালে।

দুদকের বরাত দিয়ে সমকাল সুত্রে প্রকাশ, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে নানাভাবে প্রায়ই হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয় রোগী ও স্বজনদের। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত টাকা ছাড়া সেবা পাওয়া এখানে দুস্কর। টাকা ছাড়া এক পা এগোয় না আয়া-ওয়ার্ডবয়রা। টাকা না দিলে ওয়ার্ডে প্রবেশে বাধা দেয় আনসার সদস্যরা। এসবের সঙ্গে আছে আবার পুরুষ ও নারী দালালদের দৌরাত্ম্য। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিয়োগ। এমন অনেক অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হয়রানি করায় হাসপাতালের এক ওয়ার্ডবয়কেও আটক করে দুদক। হট নম্বরে (১০৬) অভিযোগ পেয়ে হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে দুদকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।

দুদকের উপপরিচালক লুৎফর কবির চন্দন বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের একটি টিম চমেক হাসপাতাল নিয়ে কাজ করছে। সরেজমিন পরিদর্শনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত নেওয়ার পর তারা আমাকে একটি প্রতিবেদন দেবেন। পরে সেই প্রতিবেদনটি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’ দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি এই হাসপাতালটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিন হাসপাতাল পরিদর্শন করে বেশকিছু প্রমাণও পেয়েছি আমরা। হাসপাতালের একেবারে ওয়ার্ডবয় থেকে আয়া-নার্স, দালাল, আনসার পর্যন্ত সবাইকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপও করা হয়েছে। তারা এ কাজে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।’ নজরদারি শেষে চমেক হাসপাতালের সার্বিক বিষয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা দুদক কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে জানান ফখরুল ইসলাম।

চমেক হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়:চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কালীপুরের বাসিন্দা নাসিমা বেগম অভিযোগ করেন, ‘অব্যবহূত স্যালাইন দোকানে ফেরত দেওয়া যাবে কি-না জানতে চাইলে আমাকে চুল ধরে বের করে দেবেন বলেছেন ওয়ার্ডের এক আয়া। খুব বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে অপমানও করেছেন আমাকে।’ আনোয়ারা থেকে রোগী নিয়ে আসা মোহাম্মদ জামালের অভিযোগ, ‘ওয়ার্ডের গেটকিপার তার কাছ থেকে চা খাওয়ার জন্য ৬০ টাকা নিয়েও তাকে ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে দেননি।’ কুতুবদিয়ার মো. ইদ্রিসের  অভিযোগ, তার স্ত্রী নাসিমার ডেলিভারির সেলাই জোড়া লাগেনি এক মাসেও। এতে চরম কষ্ট পাচ্ছেন তিনি। সাতকানিয়া থেকে বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে আসা আকলিমা বলেন, হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য উদ্বেগজনকহারে বেড়ে গেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, রক্ত সংগ্রহ, ওষুধপত্র কেনাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দালালদের হাতে রোগীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। পুরুষদের পাশাপাশি একজন নারী দালালের দৌরাত্ম্য অনেক বেড়ে গেছে।

শামীম রাজা নামে একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন চমেক হাসপাতালে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। শামীমের অভিযোগ, চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতাল থেকে ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও ভাগ্যে জুটেছে কেবল দুটি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ। এখানকার কয়েকজনের ব্যবহার খুবই খারাপ। মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা মরিয়ম বেগমের ভাই দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার বোন বেশ কয়েকদিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিল। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সরকারি এই হাসপাতালে ছুটে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখি হয়রানি আর ভোগান্তির সীমা নেই। বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও তাও পাচ্ছি না।’ বাঁশখালীর বাসিন্দা আবু সাদেক বলেন, ‘চিকিৎসকরা কোনো ওষুধ প্রেসক্রাইব করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে রোগীর ব্যবস্থাপত্রটি নিয়ে নিতে চায় এখানকার কিছু দালাল। ব্যবস্থাপত্রটি দেখবে বলে প্রথমে নেয় তারা। পরে বলে ওষুধ কিনতে হবে তার নির্ধারিত ফার্মেসি থেকে।’ রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা সেকান্দর হোসেন প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, ‘নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাডে পরীক্ষার নাম লিখে দেওয়া হয়। ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা না করালে রোগী ও স্বজনদের করা হয় নানাভাবে হয়রানি। চিকিৎসকও সেই রিপোর্ট দেখতে চান না অনেক সময়।’ লোহাগাড়ার বড় হাতিয়ার রমজান আলীর অভিযোগ ছোট্ট বয়সী নাতনিকে হাসপাতালে ভর্তি করালেও বড় ডাক্তাররা রোগী দেখেন না। রিনা আক্তার নামে রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, আনসারদের ২০ থেকে ৫০ টাকা দিলে ওয়ার্ডে প্রবেশের সুযোগ মেলে। না হয় জোটে অপমান আর হয়রানি। লোহাগাড়ার মছদিয়া এলাকার গুরা মিয়া অভিযোগ করেন, টাকা না দেওয়ায় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের এক আনসার লাঠির আঘাতে আমার ভাইকে আহত করে। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফাহিম নামে রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানে ওষুধের দাম বাড়তি নেওয়া হয়। রুমানা আক্তার নামে অপর এক রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালের নার্স, ওয়ার্ডবয়দের আচরণ অনেক খারাপ। টাকা ছাড়া সামান্যটুকু সহযোগিতা করতে আগ্রহী হন না তারা। হাসপাতালের পরিচালক, উপপরিচালক, বিভিন্ন ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান, ওয়ার্ড মাস্টারসহ দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে গণশুনানিতে এমন অহরহ অভিযোগ প্রকাশ্যে করেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা। পিলে চমকানোর মতো এমন অভিযোগ পেয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে বেশকিছু প্রমাণও পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। যে কারণে বেশ কয়েকজন আয়া, নার্স, ওয়ার্ডবয়, আনসারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অনেককে করা হয়েছে সতর্কও।

চমেক হাসপাতালের গণশুনানিতে অংশ নিয়ে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে নানা অভিযোগ শোনার পর উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুদক কমিশনার ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ। পরে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দালাল শনাক্তে ক্যামেরা বসানোর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘অস্থায়ী কর্মচারী ও দালালদের দৌরাত্ম্য রুখতে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে। সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে শুরু করে পুরো হাসপাতালকে এমনভাবে মনিটর করতে হবে, যাতে পুরোপুরি ট্রান্সপারেন্ট হয়। হাসপাতালের সেবার মান আগে থেকে কিছুটা হলেও ভালো হয়েছে। আমরা চাই আরও ভালো হোক। এখানে অনেক কাজ করার বিষয় আছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা স্বস্তি নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করুক, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

যা বললেন হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা: চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘হাসপাতালের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রায় সময় আয়া, নার্স, আনসার, ওয়ার্ডবয়সহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব সমস্যার সমাধানে সুযোগ পেলে নিজে সরেজমিন প্রতিটি ওয়ার্ডে রাউন্ড দিয়ে আসি। বিভিন্ন অভিযোগের কারণে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে অব্যাহতি ও সতর্ক করা হয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে সমস্যা শুনতে নিয়মিত গণশুনানির আয়োজনও করেছি। এর মাধ্যমে আমরা অজানা অনেক বিষয়ে অবগত হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিয়েছি। এসব সমস্যার সমাধানে হাসপাতালে অভিযোগ বাক্সও রেখেছি।’ তিনি বলেন, ‘দুদক হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। তারাও নানা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি আমাদের জানিয়েছে। দুদককে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছি।’ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করা, বাড়তি টাকা আদায় না করাসহ ইত্যাদি বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া আছে। এর পরও আমরা যখন কোনো অভিযোগ পাই, তাৎক্ষণিক সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ সবাই রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। কিছু কর্মচারীর কারণে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ আসে। এদের মধ্যে কে দালাল তা চেনা মুশকিল। এজন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।’ 

Logo-orginal