ফ্রান্সের আধিপত্য
ফ্রান্স মরক্কোকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করেছে। ম্যাচজুড়ে ফ্রান্সের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। প্রথম মিনিট থেকেই তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং মরক্কো গোলপোস্টের নিচে ইয়াসিন বুনুর অসাধারণ সেভ সত্ত্বেও ফ্রান্স দ্রুতই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
ম্যাচের পঞ্চম মিনিটের মধ্যে ফ্রান্স দুইবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, যা পুরো ম্যাচের পূর্বাভাস দেয়। এরপর ফ্রান্সের আক্রমণাত্মক খেলা শুরু হয়। মিডফিল্ডে মাইকেল ওলিসে এবং আদ্রিয়াঁ রাবিও প্লে-মেক করছিলেন, আর এমবাপ্পে, দেজিরে দুয়ে এবং দেম্বেলে আক্রমণকে পরিণতি দেওয়ার চেষ্টা করেন।
ফ্রান্সের আক্রমণের ঢেউ সামলাতে মরক্কোর খেলোয়াড়দের নিচে নেমে রক্ষণাত্মক খেলতে হয়েছিল। এই চাপের মুখে নুসাইর মাজরাউয়ি বক্সের ভেতর এমবাপ্পেকে ফাউল করেন। এমবাপ্পে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেও, ফ্রান্সের জয়ের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিল না।
প্রথমার্ধে মরক্কো ফ্রান্সকে আটকে রাখতে পারলেও, দ্বিতীয়ার্ধে তাদের রক্ষণ ভেঙে পড়ে। ম্যাচের ৬০ মিনিটে এমবাপ্পে একটি দুর্দান্ত গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন। এর ছয় মিনিট পর দেম্বেলে আরও একটি গোল করেন, যার ফলে ৬৬ মিনিটের মধ্যে মরক্কো ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ২-০ গোলের ব্যবধানে জয় লাভ করে।
পরিসংখ্যান এবং পূর্বাভাস
ম্যাচ শুরুর আগে মরক্কোকে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হলেও, কোয়ার্টার ফাইনালে এটি ছিল একপেশে লড়াই। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের ব্যবধান ছিল মাত্র পাঁচ ধাপ। ম্যাচের প্রথমার্ধে ফ্রান্স ১৩টি শট নেয়, যেখানে মরক্কো মাত্র একটি শট নিতে সক্ষম হয়। এই ১২ শটের ব্যবধান কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ম্যাচে অবিশ্বাস্য।
১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথমার্ধে শটের ব্যবধানে এর চেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে মাত্র একবার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিল ১৭টি শট নিয়েছিল, যেখানে সুইডেন মাত্র একটি শট নিয়েছিল। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ১-০ গোলে জিতেছিল এবং পরে বিশ্বকাপের শিরোপাও ঘরে তোলে।
এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে এখন পর্যন্ত একবারও পিছিয়ে পড়তে হয়নি, যা তাদের অপ্রতিরোধ্যতার প্রমাণ। যখন ফ্রান্স এগিয়ে থাকে, তখন তারা আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ প্রতিপক্ষকে সমতায় ফেরার জন্য আক্রমণে যেতে হয়, যা ফ্রান্সের দ্রুতগতির ফরোয়ার্ডদের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। মরক্কোর বিপক্ষেও একই ঘটনা ঘটেছিল; এমবাপ্পের প্রথম গোলের পর মরক্কো সমতায় ফেরার চেষ্টা করলে উসমান দেম্বেলে পাল্টা আক্রমণ থেকে গোল করে ফ্রান্সের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন।
ফুটবল পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান অপ্টা তাদের সুপারকম্পিউটার গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে কোয়ার্টার ফাইনালের সম্ভাব্য ফলাফলের পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। তাদের বিশ্লেষণে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে ওঠার দৌড়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে। অপ্টার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ছিল ৭২.১০%, যেখানে মরক্কোর সম্ভাবনা ছিল ২৭.৯০%।
অপ্টার এই পূর্বাভাস ১০ হাজার সিমুলেশনের মাধ্যমে তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান এবং অতীত রেকর্ড বিশ্লেষণ করা হয়। অপ্টা শেষ ষোলোর ১৬টি ম্যাচের মধ্যে ১৪টির সম্ভাব্য বিজয়ী সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে সফল হয়েছিল।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ও গ্লোবো’র বিশ্লেষণভিত্তিক টুল ‘ক্রিস্টাল বল’ও তাদের নিজস্ব পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে, যেখানে ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনা নিজেদের ম্যাচে এগিয়ে রয়েছে। ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনা উভয় দলই এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪টি করে গোল করেছে। লিওনেল মেসি আট গোল নিয়ে গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন, এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ড সাতটি করে গোল নিয়ে তার ঠিক পরেই আছেন। ক্রিস্টাল বলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনার ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ১০.৫ শতাংশ।
স্পেন, ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর আক্রমণভাগ এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ফ্রান্সকে এখন পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো দলের চেয়ে বেশি চাপে ফেলতে পারে। ফ্রান্সের প্রথম একাদশ এবং বেঞ্চ উভয়ই এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হয়।
Read Also
Source: prothomalo.com