নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় মরক্কো, কুমান কৌশল নিয়ে অনড়

আফ্রিকার গর্ব মরক্কো যেভাবে হারাল নেদারল্যান্ডসকে

টাইব্রেকারে মরক্কোর জয়

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে মরক্কো। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে সমতায় শেষ হওয়ার পর এই ফলাফল আসে। ম্যাচের ৭০ শতাংশ সময় বল নিজেদের কাছে রেখেছিল মরক্কো, তবে ফিনিশিংয়ে ব্যর্থ হলেও শেষ হাসি তাদেরই ছিল।

ম্যাচের শুরুটা দুই দলই গতিময় করেছিল, তবে প্রথম ১৫ মিনিটে কোনো দলই বিপজ্জনক হতে পারেনি। ১৬তম মিনিটে মরক্কোর হাই-লাইন রক্ষণ ভেঙে সামারভিল বিপজ্জনকভাবে বক্সে ঢুকে পড়েন, তবে বল হারান এবং অফসাইডও ছিলেন। এর চার মিনিট পর ডাচ গোলকিপার দুটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। ২০তম মিনিটে কর্নার থেকে নেইল এল আয়নাউইয়ের জোরাল শট এবং পরের মিনিটে আশরাফ হাকিমির ডান পায়ের গোলা ঠেকিয়ে দেন বার্ট ভেরব্রাখেন

হাইড্রেশন বিরতির পর দুই দলই আঁটসাঁট ফুটবল খেলে। ৪৪তম মিনিটে নেদারল্যান্ডসের মিকি ফন দে ফেনের দূরপাল্লার শট বোনু আঙুলে ছুঁইয়ে ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন। যোগ করা সময়ে মরক্কো কয়েকটি আক্রমণ করে, কিন্তু আজেদিন উনায়ির শট ওপর দিয়ে চলে যায় এবং হাকিমির ফ্রি কিকে সাইবারি বলে স্পর্শ করতে পারেননি।

মাঝবিরতির পর ষষ্ঠ মিনিটে হাকিমি একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন, তার শট ক্রসবারে লেগে চলে যায়। ৫৮তম মিনিটে বিলাল এল কানুসের শট ধরে ফেলেন ভেরব্রাখেন। ৬১তম মিনিটে সাইবারির শট ব্লক করেন ভার্জিল ফন ডাইক

এরপরই ডাচরা এগিয়ে যায়। সামারভিল বক্সে ঢুকে মরক্কোর দুই ডিফেন্ডারকে এড়িয়ে বল বাড়ান, যা থেকে কোডি গাকপো জোরাল শটে গোলকিপারকে পরাস্ত করে জালে জড়ান। গাকপো এই গোলটি করেন তার অনাগত সন্তান হারানোর শোক সঙ্গী করে মাঠে নেমেছিলেন।

৯০ মিনিট শেষে যোগ করা ছয় মিনিটের প্রথম মিনিটেই মরক্কো সমতা ফেরায়। বদলি নামা তালবি নিখুঁত এক ক্রস করেন বক্সের মাঝখানে, যা থেকে ইসা জিওপ হেডে গোলকিপারকে পরাস্ত করেন। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে সুফিয়ান রাহিমির শট ভেরব্রাখেন অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্সে ঠেকিয়ে দেন। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই সতর্ক ছিল, ফলে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়।

ভুলে ভরা টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় মরক্কো
ভুলে ভরা টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় মরক্কো Credit: bangla.bdnews24.com

কোচের রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে বিতর্ক

নেদারল্যান্ডসের কোচ রোনাল্ড কুমান টাইব্রেকারে বিদায় নিলেও তার রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে অনুতপ্ত নন। তিনি দাবি করেন, মরক্কোর মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই পরিকল্পনা দলের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ছিল এবং একই পরিস্থিতি এলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নেবেন।

ম্যাচটিতে ডাচদের ঐতিহ্যবাহী আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে সরে এসে কুমান পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে রক্ষণভিত্তিক পরিকল্পনা সাজান। এই সিদ্ধান্তের জন্য ম্যাচ শেষে তিনি সমালোচিত হন। তবে সংবাদ সম্মেলনে কুমান বলেন, এই কৌশলের কারণে তার দল আগের ম্যাচগুলোর তুলনায় কম ভুল করেছে।

কুমান তার কৌশলের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, এই কৌশলে আমরা আগের ম্যাচের তুলনায় কম বল হারিয়েছি। তিনি সমালোচকদের উদ্দেশে বলেন, কৌশল নিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে, তবে সুইডেনতিউনিসিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের তুলনায় মরক্কোর মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার পরিকল্পনা সফল ছিল।

তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, যদি আবার একই পরিস্থিতি আসে, আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই একই কৌশল গ্রহণ করব। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাননি ডাচ কোচ। তার মতে, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে মরক্কো সমতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে তার পরিকল্পনাকেই সবাই সফল বলত।

কুমান আরও বলেন, যদি মরক্কো শেষ মুহূর্তে গোল না করত, তাহলে হয়তো ডাচ কোচ হিসেবে আজ প্রশংসাই পেতাম। কিন্তু এখন পাঁচ ডিফেন্ডার খেলানোর কারণেই সমালোচনা হচ্ছে। তবুও আমি বিশ্বাস করি, সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। তিনি জানান, ম্যাচের আগে এই পরিকল্পনা নিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন।

সমালোচনার জবাবে কুমান বলেন, আপনারা সমালোচনা করতেই পারেন, সেটি আপনাদের অধিকার। কিন্তু আপনারা ম্যাচ দেখেন সাইডলাইন থেকে, আর আমি দলের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নিই। কোথায় উন্নতি করতে হবে, সেটিও আমি জানি। তিনি রক্ষণাত্মক কৌশলকে ভয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখারও বিরোধিতা করেন। কুমান বলেন, এটা ভয়ের বিষয় নয়। কেন আমি ভয় পাব? মাঠে আমাদের তিনজন স্ট্রাইকার ছিল। লক্ষ্য ছিল রক্ষণকে আরও সংগঠিত করা এবং প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ করে সেভাবেই পরিকল্পনা সাজানো। কারও ভিন্ন মত থাকতে পারে, আমি সেটিকে সম্মান করি। তবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।

টাইব্রেকারের নাটকীয় মুহূর্ত

টাইব্রেকারে ১০ শটের মাত্র পাঁচটি জালে ঢোকে, যা ছিল ভুলে ভরা। নেদারল্যান্ডস দুটি টস জিতে নিজেদের পছন্দের প্রান্ত বেছে নেওয়ার পাশাপাশি আগে শট নেয়। টেওন কুপমাইনার্স গোল করে শুরু করেন। মরক্কোর প্রথম শটই মিস করেন নেইল এল আয়নাউই, তার জোরাল শট ক্রসবারের নিচে লেগে ফিরে আসে।

নেদারল্যান্ডসের দ্বিতীয় শট পোস্টে মেরে বসেন বদলি নামা জাস্টিন ক্লাইভার্ট। মরক্কোর দ্বিতীয় শট ডাচ গোলকিপার ভেরব্রাখেন ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু বল তার শরীরের নীচ দিয়ে বেরিয়ে পায়ে লেগে কোনোমতে গোল লাইন পেরিয়ে যায়। পরের শটে বাউট বেখ্রস্ট গোল করেন এবং শেমসদিন তালবিও বল জালে পাঠান।

চতুর্থ শটে আবার ভুলের পালা আসে। জুরিয়েন টিম্বার বাজে শটে অনেকটা বাইরে মেরে দেন। মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ম্যাচজুড়ে দারুণ খেলা ক্রেসেন্সিও সামারভিল টাইব্রেকারে শেষ শটে গড়বড় করেন, তার মাঝববরার শট ইয়াসিন বোনু বাম হাতে ঠেকিয়ে দেন। শেষ শটে ভেরব্রাখেনকে উল্টো প্রান্তে পাঠিয়ে সাইবারি উল্লাসে মেতে ওঠেন।

গোটা ম্যাচে ভেরব্রাখেন নেদারল্যান্ডসকে দফায় দফায় রক্ষা করেন, মোট পাঁচটি সেভ করেন তিনি, যার অন্তত দুটি ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। কিন্তু সতীর্থদের ব্যর্থতায় তার বীরত্বও যথেষ্ট হলো না শেষ পর্যন্ত।

Read Also

Source: bd-pratidin.com