স্পেনের বিশ্বকাপ জয়
নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে এই জয় নিশ্চিত হয়। এই জয়ের মাধ্যমে স্পেন ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলো।
ম্যাচ জুড়ে স্পেনের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। তারা পাসের পর পাস এবং প্রেসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রেখেছিল। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের বিপক্ষে প্রতিপক্ষ দলগুলো মাত্র ২.২ এক্সপেক্টেড গোল (xG) তৈরি করতে পেরেছে, যা তাদের রক্ষণাত্মক কাঠামোর অভূতপূর্ব দাপট প্রমাণ করে। ফাইনালেও লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের গোলমুখে একটি শটও রাখতে পারেনি।
স্পেন তাদের মাঝমাঠ ও রক্ষণে নিখুঁত প্রেসিংয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে তাদের চেনা ফুটবল খেলতে দেয়নি। বলের দখল, আক্রমণ এবং গোলের সম্ভাবনা—সবকিছুতেই স্পেনের স্পষ্ট আধিপত্য ছিল। তবে কাঙ্ক্ষিত গোলটি আসতে দেরি হচ্ছিল। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে স্পেনের জয় আটকে রেখেছিলেন।
ম্যাচের ১০৫ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস বক্সের বাইরে থেকে ভেসে আসা বল মাঠের ভেতরে রাখেন, যা ফাঁকায় পেয়ে যান ফেরান তোরেস। এরপর তিনি এক আগুনে শটে বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে শিরোপার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত
ম্যাচের ৭৫ মিনিটে মিকেল মেরিনো এবং নিকো উইলিয়ামস বদলি হিসেবে মাঠে নামেন দানি অলমো এবং অ্যালেক্স বায়েনার বদলে। এই বদলি খেলোয়াড়রা স্পেনের আক্রমণে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন। এর আগে, এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়, যা স্পেনের জন্য সুবিধা বয়ে আনে।
ইয়ামালের ফ্রি কিক এবং মিকেল ওইয়েরজাবালের শট মার্তিনেজ দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন। প্রথমার্ধে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি এবং ০-০ স্কোরলাইন নিয়ে বিরতিতে যায়। ৪৪ মিনিটে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে, তার বদলে মাঠে নামেন নিকলাস ওতামেন্দি।
লিয়ান্দ্রো পারেদেস দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মাঠে নেমে ৬ মিনিটের মাথায় হলুদ কার্ড দেখেন। রদ্রি এর্নান্দেজ মাঝমাঠের অধিনায়ক হিসেবে অনবদ্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। ২০২৫ সালের হাঁটুর চোট কাটিয়ে তিনি নিজের চেনা ছন্দে ফিরে এসেছেন। টুর্নামেন্ট জুড়ে তার অবিশ্বাস্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেছেন।

কোচ এবং দলগত শক্তি
এই নীরব বিপ্লবের কারিগর ছিলেন শান্ত ও সংযত কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ২০২৪ সালের ইউরো সাফল্যের পর এবারও তিনি মহাদেশীয় এবং বিশ্বমঞ্চের প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও দলকে শান্ত ও অবিচল রেখেছিলেন। ফাইনালের চড়া মেজাজ এবং উত্তেজনার মুখেও স্পেনের তরুণ দল ধীরস্থির ছিল।
রদ্রি গোল্ডেন বল জিতলেও স্পেনের এই বিশ্বকাপ জয়ের আসল রহস্য ছিল তাদের নিখুঁত দলগত শক্তিতে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি, জুড বেলিংহাম কিংবা আর্লিং হলান্ডদের ঘিরে তৈরি হওয়া একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক আলোর থেকে স্পেন অনেক দূরে ছিল। তারা নীরবে-নিভৃতে কেবল নিজেদের ফুটবলটাই খেলে গেছে।
দিন শেষে সেই নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলিত ভাব এবং সামষ্টিক ফুটবলের পরম পুরস্কার হিসেবেই দ্বিতীয়বারের মতো স্পেনের হাতে শোভা পেল বিশ্বকাপের ট্রফি। এই জয় কেবল একটি দলের জয় নয়, এটি আক্রমণাত্মক, ইতিবাচক এবং নান্দনিক ফুটবলের এক অপূর্ব উদ্ভাস। নিউ জার্সির এই ফাইনালে স্পেন যেভাবে নিজেদের মেলে ধরেছিল, ট্রফিটা তাদের হাতে না উঠলে তা এক পরম অবিচার হতো।
ফাইনালে মারিও আলবার্তো কেম্পেস এবং আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, যারা তাদের নিজ নিজ দেশকে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ দিয়েছিলেন, তারা শিরোপা উঁচিয়ে ধরেন।
Read Also
Source: prothomalo.com