নেত্রকোনার দুর্গাপুরে বিশ্বকাপের উন্মাদনা
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে আর্জেন্টিনা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠায় স্থানীয় সমর্থক ও ফুটবলপ্রেমীরা একটি বিশেষ ভোজের আয়োজন করেছিলেন। একতা সমিতির উদ্যোগে এই আয়োজন করা হয়। সমিতির সদস্য ও সমর্থকদের আর্থিক সহায়তায় প্রায় দুই লাখ টাকা দিয়ে একটি মহিষ কেনা হয়েছিল। ১৯ জুলাই সকালে মহিষটি জবাই করা হয় এবং পৌরসভার মার্কাস মোড় এলাকায় দিনব্যাপী ভোজের ব্যবস্থা করা হয়। রাতে ক্লাবের সদস্য ও সাধারণ দর্শকদের জন্য বড় পর্দায় খেলা দেখারও আয়োজন ছিল।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আর্জেন্টিনার প্রতি দীর্ঘদিনের আবেগ বিদ্যমান। এই দেশ, যা কখনও বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেনি, তারা বৈশ্বিক এই আসরকে নিজেদের করে নেয় অনন্য আবেগের সাথে। আর্জেন্টিনার প্রতি এই উন্মাদনা দশকের পর দশক ধরে টিকে আছে। অনেকেই মনে করেন, আর্জেন্টিনার বাইরে আলবিসেলেস্তেদের সবচেয়ে বেশি সমর্থক বাংলাদেশেই রয়েছে।
ফাইনালে হারের পর হতাশা
তবে, এই উৎসব শেষ পর্যন্ত হতাশায় পর্যবসিত হয়। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে আর্জেন্টিনা শিরোপা হাতছাড়া করায় সমর্থকদের আনন্দ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায়। খেলা শুরু হওয়ার পর থেকেই সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিতে শুরু করে। দর্শকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আর্জেন্টিনা মাঠে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। সময় যত গড়িয়েছে, সমর্থকদের উৎকণ্ঠাও তত বেড়েছে।
শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলে স্পেন জয় নিশ্চিত করলে উপস্থিত আর্জেন্টিনা সমর্থকরা হতাশায় ভেঙে পড়েন। একতা সমিতির সভাপতি হোসেন আলী জানান, নির্ধারিত সময়েও গোল হয়নি এবং অতিরিক্ত সময়েও তারা আশা ছাড়েননি। কিন্তু শেষ মুহূর্তের একটি গোলেই সব শেষ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, এরপর আর্জেন্টিনা আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি, তবুও তাদের ভালোবাসা সব সময়ই আর্জেন্টিনার জন্য থাকবে।

সমিতির উপদেষ্টা তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন যে, বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচই তারা সমিতির কার্যালয়ের সামনে বড় পর্দায় দেখিয়েছেন। তারা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলে মহিষ জবাই করে ভোজের আয়োজন করা হবে, এবং তারা সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। তিনি বলেন, খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই এবং ১৯ জুলাইয়ের দিনটি আর্জেন্টিনার ছিল না।
বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা
বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকদের আনুগত্য ঐতিহ্যগতভাবে দক্ষিণ আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে বিভক্ত। অনেক সমর্থকের কাছে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসার শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার পারফরম্যান্স দিয়ে। নুরুল ইসলাম নামের একজন মোটর মেকানিক জানান, আর্জেন্টিনার প্রতি তার ভালোবাসা এসেছে তার বাবার কাছ থেকে, যিনি ম্যারাডোনার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। এই আবেগ এখন তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, তার দুই সন্তানও আর্জেন্টিনার সমর্থক এবং তারা নতুন জার্সি কেনার জন্য জেদ ধরেছিল।
সমর্থকদের এই উৎসাহের কারণে রেপ্লিকা জার্সির বিক্রিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ স্পোর্টস এক্সেসরিজ মার্চেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা শামীম পাটোয়ারী জানান, জার্সির চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। গ্যালাক্সি স্পোর্টস নামের একটি বড় স্পোর্টসওয়্যার খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে মোট বিক্রি হওয়া জার্সির প্রায় ৩০ শতাংশই হলো আর্জেন্টিনার জার্সি।
রায়হান হোসেন নামের একজন বিক্রেতা বলেন, কিছু অভিভাবক তাদের নবজাতকের জন্যও আর্জেন্টিনার জার্সি কিনেছেন এবং তাদের স্টকে থাকা আর্জেন্টিনার প্রায় সব জার্সিই বিক্রি হয়ে গেছে, বিশেষ করে প্লেয়ার এডিশনের জার্সিগুলো। তিনি আরও জানান, অনেক সমর্থকের কাছে আর্জেন্টিনার প্রতি আবেগের তুলনায় জার্সির দাম খুবই গৌণ বিষয়। একজন অটোরিকশাচালক ১২০০ টাকা মূল্যের একটি প্লেয়ার এডিশন জার্সি কিনে নিয়ে গেছেন, যা তার দৈনিক আয়ের তুলনায় অনেক বেশি।
ঢাকার নিম্ন আয়ের এলাকাগুলোতে ফুটপাতের বিক্রেতারা তাদের সাধারণ জিনিসপত্র সরিয়ে রেখে ফুটবল জার্সি বিক্রি করছেন, যাতে সমর্থকরা সাধ্যের মধ্যে তা কিনতে পারেন। আল মামুন নামের ৫৫ বছর বয়সী একজন বিক্রেতা জানান, তিনি ম্যারাডোনার খেলা দেখেছেন এবং এরপর থেকেই আর্জেন্টিনার অনুগত সমর্থক হয়ে আছেন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৩তম হলেও প্রতি চার বছর পরপর সারা দেশে ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে আবেগের টান তীব্র রূপ নিতে পারে। হোসেন আলী বলেন, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সবাইকে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করা এবং ফুটবল উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা।
Read Also
Source: jugantor.com