মেসির আবেগঘন মুহূর্ত এবং ফুটবল বিশ্বের প্রতিক্রিয়া
ফুটবল যদি রূপকথা হতো, তাহলে তার শেষটা হয়তো অন্যরকম হতো। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে একটি ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসিকে রানার্সআপ মেডেল পরার সময় ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার চোখে জল। এই দৃশ্যটি ফুটবল মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে অনেকেই মেসির আবেগ এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
ফক্স স্পোর্টসের স্টুডিওতে বসে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ এবং থিয়েরি অঁরি মেসির এই মুহূর্ত নিয়ে কথা বলেছেন। ইব্রাহিমোভিচ উল্লেখ করেন, এই টুর্নামেন্টে মেসিকে মন ভরে উপভোগ করা গেছে এবং বিশ্বকাপ জিততে না পারায় তিনি ভীষণ দুঃখী। তবে ইব্রাহিমোভিচ মেসির পারফরম্যান্সকে ‘অবিশ্বাস্য’ এবং ‘জাদুকরি’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে তিনি প্রায় একা হাতেই দলকে টেনে নিয়ে গেছেন।
মেসি তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিক থেকে এটি তার সেরা বিশ্বকাপগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে। টুর্নামেন্টে তিনি আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন। প্রথম পাঁচটি ম্যাচেই তিনি গোল করেছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনালে গোল না পেলেও তিনি তিনটি গোল তৈরি করে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে তার বাড়ানো দুটি পাসকে ফুটবল ইতিহাসের ‘জাদুঘরে রাখার মতো’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইব্রাহিমোভিচ মেসির এই পারফরম্যান্সকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, কখনো মনে হয়েছে মেসি এই গ্রহের কেউ নন, আবার কখনো তিনি রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠেছেন।
রেকর্ড এবং স্প্যানিশ কৌশল
এই আট গোল মিলিয়ে বিশ্বকাপে মেসির গোল সংখ্যা এখন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় পৌঁছেছে। গ্রুপ পর্ব শেষেই তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছিলেন এবং টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ সময়ই রেকর্ডটি তার দখলে ছিল। তবে কিলিয়ান এমবাপ্পে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি গোল করে এই রেকর্ডটি মেসির কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন।
ফাইনালে মেসি এই রেকর্ডটি পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। আর্জেন্টিনা ম্যাচে মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছিল, যার একটিও অন-টার্গেট ছিল না। মেসি নিজেও একটি শট নিয়েছিলেন, কিন্তু তার বাড়ানো পাঁচটি ক্রসের মধ্যে মাত্র একটি সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছিল। স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলের কারণে মেসিকে ম্যাচে বেশ একাকী মনে হয়েছে।
থিয়েরি অঁরি অবশ্য মেসির এই পরিস্থিতিকে স্পেনের কৌশলের কৃতিত্ব দিয়েছেন। আর্সেনাল এবং বার্সেলোনার এই কিংবদন্তি বলেছেন, মেসির বিপক্ষে বাজি ধরা যায় না এবং আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে স্পেনের মতো একটি দলই লাগতো।
ডেনমার্কের সাবেক গোলকিপার ক্যাসপার স্মাইকেল মনে করেন, বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে মেসির মতো ফুটবলারকে মাপা বোকামি। স্মাইকেলের মতে, মেসি বিশ্বকাপে জেতার চেয়ে ফাইনাল বেশি হেরেছেন, তবুও তিনি ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। তিনি আরও বলেছেন যে, ফুটবল শুধু জেতা নয়, খেলাকে কী দেওয়া হলো সেটাই আসল, আর মেসি খেলাকে যা দিয়েছেন তার কোনো তুলনা হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তারকা অ্যালেক্সি লালাস এবং ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার পিটার ক্রাউচও একই সুরে কথা বলেছেন। লালাস বলেছেন, মেসি একজন চ্যাম্পিয়ন এবং চ্যাম্পিয়নরা সবকিছু জিততে চায়। তিনি তার ক্যারিয়ারে সবকিছুই জিতেছেন, তাই এই হার তাকে হতাশ করবে। লালাস মনে করেন, ম্যাচের স্কোরলাইন ভুলে মেসির আইকনিক, গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিশ্বাস্য ফুটবলার হিসেবে তার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
পিটার ক্রাউচ স্পেনের বর্তমান দলটির উদাহরণ টেনে বলেছেন, আজকের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের প্রায় সব খেলোয়াড়ই ছোটবেলায় মেসিকে দেখে বড় হয়েছেন এবং তার খেলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ক্রাউচ মেসিকে একজন জিনিয়াস হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, যদি এটি তার শেষ বিদায় হয়, তবে মনে রাখতে হবে আমরা ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে বিদায় জানালাম।
মেসির ভবিষ্যৎ এবং আবেগ
ফাইনালে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মেসির কান্নার ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রুপালি মেডেল যখন তার গলায় ঝুলছিল, তখন তার চোখ থেকে জল পড়ছিল। থিয়েরি অঁরি এই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছেন, এই হার মেসির জন্য কতটা কষ্টের। তিনি আরও বলেছেন, যদি কারো মনে সন্দেহ থাকে যে এই বয়সেও মেসির জেতার ক্ষুধা আছে কিনা, তবে তার মুখের দিকে তাকাতে হবে। মেসি জীবনে সবকিছু জিতেছেন, তবুও এই কান্না তার দেশের প্রতি ভালোবাসা, প্যাশন এবং মাঠে নিজের সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার প্রতীক।
এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রানার্সআপ মেডেল গলায় নিয়ে এই কান্না কি আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ দৃশ্য? ইব্রাহিমোভিচ চান না মেসির এই যাত্রা এখানেই শেষ হয়ে যাক। তিনি আশা করেন মেসি যতদিন সম্ভব খেলা চালিয়ে যাবেন, যাতে ফুটবলপ্রেমীরা তাকে আরও বেশি উপভোগ করতে পারেন। ইব্রাহিমোভিচ বলেছেন, ফুটবলে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না, তবে মেসি খেলছেন এটাই সবার আনন্দ। যেদিন তিনি খেলা ছেড়ে দেবেন, সেদিন সবার মন খারাপ হবে।
মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি আর সেই মানুষটি নন, যিনি কয়েক দিন আগেও প্রতিপক্ষের ডিফেন্স নিয়ে খেলছিলেন। তার দৌড় কম ছিল, চোখে ক্লান্তি ছিল, শরীর যেন বারবার থেমে যেতে চাইছিল। পুরো টুর্নামেন্টে যে মানুষটি সময়কে হারিয়ে দিয়েছিলেন, ফাইনালে তাকেই সময় ধরে ফেলল।
তবে এই ক্লান্তি মোটেও বয়সের ছিল না। এটি ছিল গোটা দলকে একা টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়া একজন মানুষের ক্লান্তি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা যেন মেসিকে খুঁজতেই ভুলে গিয়েছিল। যে বলগুলো তার পায়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো অকারণ তাড়াহুড়োয় হারিয়ে গেছে। যে মুহূর্তগুলোতে দলের সবচেয়ে সৃজনশীল খেলোয়াড়কে খুঁজে নেওয়া দরকার ছিল, সেখানে আর্জেন্টিনা অন্য লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। ফাউল, ধাক্কাধাক্কি, উত্তেজনা এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে তারা ম্যাচের ছন্দ হারিয়েছে।
পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির মুখটি তাই আলাদা করে চোখে লেগে থাকে। চোখে জল ছিল, কিন্তু লুকানোর কোনো নাটকীয়তা ছিল না। ছিল শুধু নিঃশব্দ ক্লান্তি। এই ক্লান্তি দেখে মায়া হয়।
এই টুর্নামেন্টে মেসিই ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল ফুটবলার। কিন্তু ফাইনালের রাত তাকে বিজয়ী নয়, পরাজিত হিসেবেই মনে রাখবে। ইতিহাস হয়তো তার গোল-অ্যাসিস্ট বা অসাধারণ পারফরম্যান্সের কথা লিখবে। কিন্তু সেই ইতিহাসের পাতায় আরেকটি ছবিও থাকবে—ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকা এক ক্লান্ত মানুষের।
ইব্রাহিমোভিচ আশা করেন মেসি যতদিন সম্ভব খেলা চালিয়ে যাবেন, যাতে ফুটবলপ্রেমীরা তাকে আরও বেশি উপভোগ করতে পারেন।
Read Also
Source: prothomalo.com