ইংল্যান্ড ও নরওয়ের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল: হালান্ড বনাম জন্মভূমি

হালান্ডের রূপকথা, নাকি ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান? - Jugantor

নরওয়ে এবং ইংল্যান্ড একটি আবেগঘন বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হতে চলেছে, যেখানে আর্লিং হালান্ড তার জন্মভূমি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলবেন। শনিবার রাত ৩টায় (বাংলাদেশ সময়) এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। একসময় বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে একসঙ্গে খেলা হালান্ড এবং জুড বেলিংহাম এবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একে অপরের প্রতিপক্ষ।

হালান্ড এই ম্যাচটিকে ‘বিশেষ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের হয়ে খেলছেন। তার বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড যখন লিডস ইউনাইটেডের হয়ে খেলছিলেন, তখন ২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডস শহরে হালান্ডের জন্ম হয়। ছোটবেলায় তিনি পরিবারের সাথে নরওয়ের ব্রাইনে শহরে চলে যান এবং সেখানেই তার ফুটবলার হিসেবে বেড়ে ওঠা। হালান্ড বলেছেন, যেহেতু তিনি ইংল্যান্ডে খেলেন এবং সেখানে তার অনেক সতীর্থ আছেন, তাই ম্যাচটি ভিন্ন রকমের অনুভূতি দেবে এবং এটি উপভোগ্য হবে।

নরওয়ের রূপকথা ও হালান্ডের প্রভাব

বিশ্বকাপ শুরুর আগে খুব কম মানুষই নরওয়েকে শেষ আটে কল্পনা করেছিলেন। তবে তারা ব্রাজিলকে হারিয়ে এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। নরওয়ের কোচ স্টলে সোলবাকেন এই জয়কে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ে এবার ইতিহাস গড়ছে। হালান্ড এই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে অন্যতম শীর্ষে আছেন এবং ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে শেষ আটে তুলেছেন।

হালান্ড বিশ্বাস করেন যে, চাপ পুরোটাই ইংল্যান্ডের ওপর। তিনি বলেছেন, সবাই ইংল্যান্ডকে ফেভারিট বলছে এবং নরওয়ে শুধু তাদের নিজস্ব ফুটবল খেলতে চায়। হালান্ডের মতে, ভয়হীন ফুটবলই নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি একটি জাতির আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিচ্ছেন এবং তার ভাইকিং উদযাপন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য। নরওয়ের শহর থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়াম পর্যন্ত এখন হালান্ড উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে।

তবে নরওয়ের শক্তি শুধু হালান্ড নন। দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা, প্যাট্রিক বার্গের বুদ্ধিদীপ্ত মাঝমাঠ এবং আন্দ্রেয়াস স্কেলদেরুপের গতি দলটিকে আরও পরিণত করেছে। সাবেক ডিফেন্ডার ওডিন বিওরটুফটও মনে করেন, নরওয়ের আসল শক্তি তাদের ঐক্য এবং দলগত ফুটবল। হালান্ড নিজেও স্বীকার করেছেন যে, নরওয়েকে নিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা তার কাছেও বিস্ময়কর। তিনি বলেছেন, নরওয়েতে মানুষ যেভাবে উদযাপন করছে, তা দেখলে বোঝা যায় এটি তাদের জন্য একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষা

অন্যদিকে, ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে পারেনি। প্রতিটি বিশ্বকাপ নতুন আশা নিয়ে শুরু হলেও শেষ হয়েছে হতাশায়। এবার সেই চক্র ভাঙতে চান কোচ থমাস টুখেল। জার্মান এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর ইংল্যান্ডের খেলায় নতুন প্রাণ এসেছে। আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি দলের মানসিক দৃঢ়তাও বেড়েছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ১০ জন নিয়ে লড়াই করে ইংল্যান্ড যে জয় তুলে নিয়েছে, সেটিকে টুখেল ‘নায়কোচিত পারফরম্যান্স’ বলে বর্ণনা করেছেন।

টুখেল মনে করেন, এই দলের হৃদয় আছে এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা লড়তে জানে। তিনি বলেছেন, এমন অভিজ্ঞতা একজন কোচ হিসেবে তিনি কখনও ভুলবেন না। টুখেল আরও বিশ্বাস করেন যে, চাপ সবসময় নেতিবাচক নয় এবং বড় দল হওয়ার অর্থই হলো চাপ নিয়ে খেলতে শেখা। এই চাপই ইংল্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেছেন, বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এর জন্যই তারা বেঁচে থাকেন এবং এই ট্রফিটাই প্রতিটি ফুটবলারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। চলতি বিশ্বকাপেও কেইন দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, ডেকলান রাইসের নিয়ন্ত্রণ, বুকায়ো সাকার গতি এবং ফিল ফোডেনের কারুকাজ মিলিয়ে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ এখন বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর।

কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটি হবে দুর্দান্ত। ইংল্যান্ড চাইবে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। ডেকলান রাইস ও বেলিংহাম ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে নরওয়ের ওপর চাপ বাড়বে। নরওয়ের লক্ষ্য থাকবে দ্রুত বল জিতে ওডেগার্ডের পাসে হালান্ডকে খুঁজে বের করা। সবচেয়ে বড় লড়াই হবে ইংল্যান্ডের রক্ষণ বনাম হালান্ড। জন স্টোনসরা যদি হালান্ডকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেন, তাহলে নরওয়ের আক্রমণ অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যেতে পারে। ইংল্যান্ড শিবিরও জানে, এই ম্যাচ সহজ হবে না। দলের তরুণ মিডফিল্ডার নিকো ও’রাইলি বলেছেন, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডের বড় শক্তি এবং আগের দুই বিশ্বকাপের শিক্ষা এবার কাজে লাগাতে চায় দল।

হালান্ডের রূপকথা, নাকি ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান?
হালান্ডের রূপকথা, নাকি ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান? Credit: jugantor.com

এক মুহূর্তের অসাবধানতা মানেই গোল। একটি কর্নার, একটি হেড, একটি দুর্দান্ত সেভ কিংবা একটি ভুল পাস কোটি মানুষের ভাগ্যের গল্প বদলে দিতে পারে। হালান্ড আশা করছেন, তিনি নরওয়েকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলতে পারবেন।

অন্যদিকে, হ্যারি কেইন তার আজীবনের স্বপ্নের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে চান। জুড বেলিংহাম আবারও প্রমাণ করতে চান, কেন তাকে ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ বলা হয়। টুখেলের ইংল্যান্ডও নতুন ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় আছে।

এই ম্যাচটি মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত হবে।

Read Also

Source: jugantor.com