রদ্রিকে গোল্ডেন বল প্রদান নিয়ে বিতর্ক, মেসিকে সেরা ঘোষণা করল আইএফএফএইচএস

কেন মেসির বদলে রদ্রি জিতলেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল?

বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল বিতর্ক

সম্প্রতি শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতেছে। এই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার রদ্রির হাতে উঠেছে, যা অনেককে বিস্মিত করেছে। কারণ এই পুরস্কারের দৌড়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। রদ্রি আটটি ম্যাচের সবকটিতে খেললেও কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল মহলে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ভক্তের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, গোল বা অ্যাসিস্ট না করেও একজন মিডফিল্ডার কীভাবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন। এটি ২০২৪ সালে রদ্রিব্যালন ডি’অর জয়ের সময়কার বিতর্ককেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

৩৯ বছর বয়সী মেসি এই বিশ্বকাপে আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফাইনালের আগ পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচেই তার গোল বা অ্যাসিস্ট ছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং ম্যাচ জেতানোর অসাধারণ ক্ষমতার কারণে মেসিগোল্ডেন বলের যোগ্য দাবিদার।

ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে, যিনি ১০টি গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন, এবং ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম, যিনি সাতটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন, তারাও গোল্ডেন বলের দৌড়ে ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই দুর্দান্ত একটি আসর কাটিয়েছেন।

ফিফার গোল্ডেন বল নির্বাচনের প্রক্রিয়া

গোল্ডেন বল পুরস্কারের ভিত্তি কী, তার মধ্যেই এই বিতর্কের উত্তর লুকিয়ে আছে। বিশ্বকাপগোল্ডেন বুট কেবল সর্বোচ্চ গোলের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। তবে গোল্ডেন বল দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ভিন্ন। এটি ফিফাটেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ (টিএসজি) এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ইতালির স্ট্রাইকার পাওলো রসি প্রথম এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। তখন থেকেই কেবল পরিসংখ্যানের চেয়ে বিচারকদের সার্বিক মূল্যায়নের গুরুত্ব এখানে বেশি।

গোল্ডেন বল বিজয়ী নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেল শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দেখে না। তারা একজন খেলোয়াড়ের ট্যাকটিক্যাল প্রভাব, পুরো টুর্নামেন্টে তার ধারাবাহিকতা, টেকনিক ও শারীরিক সামর্থ্য, নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো মূল্যায়ন করে। এছাড়াও, পাসিংয়ের নিখুঁত হার, রক্ষণ সামলাতে অবদান, বল পুনরুদ্ধার, ড্রিবলিংয়ের সাফল্য এবং ওয়ার্ক রেটের মতো আধুনিক সূচকগুলোও ফিফা বিশ্লেষণ করে।

এই বিবেচনায় রদ্রির সার্বিক পারফরম্যান্স এবং স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়। ম্যানচেস্টার সিটির এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এবারের বিশ্বকাপে ৯১০ বার বল ছুঁয়েছেন, যা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ। তিনি সফলভাবে ৭৫৬টি পাস দিয়েছেন, যা সর্বোচ্চ। তার পাস দেওয়ার নির্ভুলতার হার ছিল ৯৩.২ শতাংশ।

আক্রমণভাগের শেষ অংশে (ফাইনাল থার্ডে) রদ্রি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ২০৪টি পাস দিয়েছেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, স্পেনের প্রতিটি আক্রমণ তাকে ঘিরেই গড়ে উঠত। ডিফেন্সিভ পজিশনে খেলে থেকেও সুযোগ তৈরির দিক থেকে তিনি ১৫তম স্থানে ছিলেন, যা প্রমাণ করে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি তিনি আক্রমণভাগেও সমান কার্যকর ছিলেন।

যখন বল প্রতিপক্ষের পায়ে থাকত, রদ্রি তখনও সমান প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ২৬টি ট্যাকল করেছেন। এছাড়া, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার দিক থেকে (মিডল ও অ্যাটাকিং থার্ডে) তিনি সেরা চার খেলোয়াড়ের একজন ছিলেন। এই সংখ্যাগুলো রদ্রির পারফরম্যান্সের একটি অংশ মাত্র। তিনি স্পেনের মাঝমাঠের স্পন্দন ছিলেন এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার কারণেই ফাবিয়ান রুইজদানি ওলমোর মতো আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডাররা অনেকটা স্বাধীনভাবে মাঠের উপরের দিকে খেলতে পেরেছেন। তার পজিশনাল ডিসিপ্লিনের কারণে পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের দলগত পারফরম্যান্স ছিল সবচেয়ে গোছানো ও ভারসাম্যপূর্ণ।

পুরো আসরে স্পেন বল দখলে ভীষণ আধিপত্য দেখিয়েছে। আট ম্যাচের সাতটিতেই তারা জাল অক্ষত রেখে মাত্র একটি গোল খেয়েছে। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়েছে তারা, যেখানে মেসির দল একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। স্পেনের এমন প্রতিটি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রদ্রি, যদিও তিনি কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট পাননি। আর ঠিক এ কারণেই ফিফার টেকনিক্যাল প্যানেল ও সাংবাদিকরা তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

আইএফএফএইচএস-এর মূল্যায়ন

এদিকে, আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সংস্থা (আইএফএফএইচএস) ফিফার এই সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে লিওনেল মেসিকেই টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার হিসেবে ঘোষণা করেছে। ডেটা-পারফরম্যান্স সূচক বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি আর্জেন্টিনা অধিনায়ককে সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বেছে নিয়েছে।

আইএফএফএইচএস জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব পারফরম্যান্স ইনডেক্সের ওপর ভিত্তি করে এই খেতাব দেওয়া হয়েছে। এটি একটি আধুনিক ডেটাভিত্তিক পদ্ধতি, যেখানে টুর্নামেন্টজুড়ে একজন খেলোয়াড়ের গোল, অ্যাসিস্ট, প্রতিটি ম্যাচের রেটিং এবং নকআউট পর্বের প্রভাবকে সুনির্দিষ্ট সমীকরণের মাধ্যমে হিসাব করা হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের বিস্তারিত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পরেই সংস্থাটির কারিগরি প্যানেল এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

নিজেদের সিদ্ধান্ত সমর্থনের পেছনে মেসিকে দেওয়া রেটিংয়ের খতিয়ান তুলে ধরেছে আইএফএফএইচএস। পুরো আসরে খেলা আটটি ম্যাচে মেসির আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট ছিল। টুর্নামেন্টজুড়ে তার গড় ম্যাচ রেটিং ছিল ৮.৩৩।

পরিসংখ্যান সংস্থার মূল্যায়নে নকআউট পর্বের পারফরম্যান্স বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিদায়ের শঙ্কায় থাকা ম্যাচগুলোতে দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার ক্ষমতা একজন খেলোয়াড়ের প্রকৃত মাহাত্ম্য প্রকাশ করে। নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার অগ্রগতিতে মেসির অবদান ছিল অবিসংবাদিত। আইএফএফএইচএস স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তিগত পরিচিতি বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং শতভাগ তথ্য-উপাত্ত এবং পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেই মেসিকে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা করা হয়েছে।

আর্জেন্টিনা দলে মেসির প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বকাপে তাদের ১৯টি গোলের ১২টিতেই তার অবদান ছিল। বেশ কয়েকটি ম্যাচ তিনি একাই জিতিয়েছেন। কিলিয়ান এমবাপে ১০টি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে একটি দারুণ আসর কাটিয়েছেন। জুড বেলিংহ্যাম সাতটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে বিশ্বসেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

তাই অনেকেই মনে করেন, মেসির প্রভাব বেশি ছিল, যার কারণও পরিষ্কার। রদ্রির নেতৃত্ব ও ট্যাকটিক্যাল প্রভাব যেমন দারুণ ছিল, তেমনি মেসি নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি একাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন। গোল্ডেন বল নিয়ে বিতর্ক এ কারণে থামছে না। গোল্ডেন বুটের মতো এখানে কোনো পাকা ফর্মুলা নেই। একদল সব সময় গোলদাতা ও ম্যাচ উইনারদের বড় করে দেখবেন। অন্য দলের মতে, খেলা নিয়ন্ত্রণ করা, ছন্দ তৈরি করা এবং পুরো দলকে একসঙ্গে সচল রাখাও কম মূল্যবান নয়। এবার ফিফার স্বীকৃত ভোটাররা বেছে নিয়েছেন দ্বিতীয় পথটি। রদ্রি কি সত্যিই ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, নাকি স্রেফ চ্যাম্পিয়ন দলের সেরা খেলোয়াড়— এই তর্ক স্পেনের উৎসবের রেশ কেটে যাওয়ার পরেও বহু দিন চলবে।

আর্জেন্টিনাকে বিশেষ বার্তা ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর
আর্জেন্টিনাকে বিশেষ বার্তা ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর Credit: jugantor.com

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি এই আসরকে কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। বিপরীতে, রদ্রি স্পেনকে দিয়েছেন ছন্দ ও কার্যকারিতা। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন ভূমিকাকে বেশি মূল্যায়ন করেছেন— গোল্ডেন বল তারই রায়।

মেসিকেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা
মেসিকেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা Credit: jugantor.com

Read Also

Source: bangla.thedailystar.net