মেক্সিকো সিটিতে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে মেক্সিকোর জয়

৪০ বছর পর নকআউট ‘অভিশাপ’ কাটাতে পারল মেক্সিকো

মেক্সিকোর ঐতিহাসিক জয়

মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে মেক্সিকো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে উঠেছে। এই জয়টি ৪০ বছর পর বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে মেক্সিকোর প্রথম জয়। এর আগে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে, যখন মেক্সিকো স্বাগতিক ছিল, তখন তারা বুলগেরিয়াকে একই ব্যবধানে (২-০) হারিয়েছিল। এই জয়ের ফলে রাউল হিমিনেজ এবং হুলিয়ান কিনিয়োনেস-এর মতো খেলোয়াড়রা ৪০ বছরের নকআউট ‘অভিশাপ’ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন।

ম্যাচটি বজ্রঝড়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর শুরু হয়েছিল। ৮০ হাজার ৮২৪ জন দর্শক খেলা শুরুর অনেক আগেই গ্যালারি পূর্ণ করে তুলেছিল। প্রকৃতির শান্ত হওয়ার পর মেক্সিকো মাঠে গতিময় ফুটবল উপহার দেয়, প্রথম আধা ঘণ্টার মধ্যেই দুটি গোল করে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে মেক্সিকো আজতেকা স্টেডিয়ামে টানা ১০টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রেখেছে।

৮০ হাজার দর্শকের গর্জনে ৪০ বছর পর নকআউটে জয় মেক্সিকোর
৮০ হাজার দর্শকের গর্জনে ৪০ বছর পর নকআউটে জয় মেক্সিকোর Credit: bangla.bdnews24.com

এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সআর্জেন্টিনার পাশাপাশি মেক্সিকো গ্রুপ পর্বে তাদের তিনটি ম্যাচেই জয়লাভ করে এবং কোনো গোল হজম করেনি। শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে সেই দাপট ধরে রেখেই স্বাগতিকরা ম্যাচটি জিতেছে।

ম্যাচের বিবরণ ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত

ম্যাচের ২২তম মিনিটে হুলিয়ান কিনিয়োনেস মেক্সিকোর হয়ে প্রথম গোলটি করেন। বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে ডান পায়ের জোরালো শটে তিনি গোলটি করেন। এরপর ৩১তম মিনিটে রাউল হিমিনেজ দ্বিতীয় গোলটি করেন। বক্সের ভেতর ঢুকে কিনিয়োনেসের ফিরতি পাস পেয়ে দারুণ শটে এই স্ট্রাইকার গোলটি জালে জড়ান। ইকুয়েডর প্রথমার্ধেই প্রায় ‘নকআউট’ হয়ে যায়, যদিও তাদের বল দখলের হার ৫৫.৭ শতাংশ ছিল। তবে তারা মাত্র ৫টি শট নিতে পেরেছিল, যার মধ্যে ১টি পোস্টে ছিল। মেক্সিকো ১৪টি শটের মধ্যে ৩টি পোস্টে রাখতে সক্ষম হয়, যার মধ্যে থেকে ২টি গোল আসে।

ম্যাচের যোগ করা সময়ে (৯৫ মিনিট) ইকুয়েডরের সেন্টারব্যাক পিয়েরো হেনকাপিয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। মেক্সিকোর একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সময় মুখ ঢেকে কথা বলার কারণে ভিএআরের হস্তক্ষেপে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাচেচে মেক্সিকো সিটিতে দলের ফ্লাইট পৌঁছাতে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে আয়োজক ব্যবস্থাপনার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তার সংবাদ সম্মেলন নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা পরে শুরু হয়েছিল, কারণ ওহাইও-র কলম্বাস থেকে মেক্সিকোয় যাওয়ার অপ্রত্যাশিত দীর্ঘ যাত্রা।

বেকাচেচে ব্যাখ্যা করেন যে, তাদের পৌঁছাতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৩ ঘণ্টা দেরি হয়েছিল। যে ফ্লাইটটি সাড়ে ৩ ঘণ্টার হওয়ার কথা ছিল, যার সাথে হোটেলে যাওয়ার আরও ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটের পথ যুক্ত হওয়ার কথা, তা শেষ পর্যন্ত ৯ ঘণ্টার যাত্রায় পরিণত হয়। এই জটিলতা সত্ত্বেও কোচ বিষয়টিকে খুব বড় করে দেখতে চাননি এবং আশ্বস্ত করেন যে, ক্লান্তি দলের মনোবলকে প্রভাবিত করবে না। তিনি ফিলাডেলফিয়া, কানসাস এবং নিউ ইয়র্কে আগের ম্যাচগুলোর আয়োজনের সাথে এই অভিজ্ঞতার তুলনা করেন, যেখানে ‘সবকিছু ছিল নিখুঁত এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল’।

ঐতিহাসিক অর্জন ও পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

এই ম্যাচে মেক্সিকোর ১৭ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা একাদশে সুযোগ পেয়ে ইতিহাস গড়েন। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে শুরুর একাদশের হয়ে মাঠে নামার কীর্তি গড়েন মোরা। এই জয় মেক্সিকোকে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নিয়ে গেছে, যেখানে তারা ইংল্যান্ড অথবা ডিআর কঙ্গোর মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

মেক্সিকোর গতির সঙ্গে ইকুয়েডর পেরে উঠছিল না। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে লুইস রোমোর নিচু শট বাইরে দিয়ে চলে যায়। পরের মিনিটে তার নিখুঁত ক্রস থেকে হিমেনেসের হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। প্রথম ১০ মিনিটে আক্রমণের স্রোত সামলে ইকুয়েডর একটু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অষ্টাদশ মিনিটে গন্সালো প্লাতা দুর্দান্তভাবে তার প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়েন। জন ইবোয়া এগিয়ে এসে বক্সে ঢুকে পড়েন এবং তার বাঁ পায়ের জোরাল শটে বল কাছের পোস্টে লেগে বাইরের জালে জড়ায়।

তবে এর মধ্যেই মেক্সিকো এগিয়ে যায় ২২তম মিনিটে। ইকুয়েডরের আক্রমণ ঠেকিয়ে দারুণভাবে বল বাড়ান হেসুস গাইয়ার্দো। নিজের অর্ধে থেকেই অফসাইড ফাঁদ এড়িয়ে বাম দিক দিয়ে ছুটতে থাকেন কিনিয়োনেস। এরপরই দেখা যায় বিধ্বংসী একক নৈপুণ্য। সরাসরি গোলের দিকে দৌড়ে গিয়ে বক্সের ঠিক ভেতর থেকে এক অপ্রতিরোধ্য শট নেন। সেই গোলা সামলানোর উপায় ছিল না গোলকিপারের। পরের গোলটি আসে দ্রুতই। সেখানে বড় অবদান ইকুয়েডরের রক্ষণভাগের বড় ভুলের। তবে হিমেনেসের ফিনিশিং ছিল দুর্দান্ত।

চতুর্থ বিশ্বকাপে এসে প্রথম গোলের পর এবার আরও একটি গোল যোগ করলেন রাউল হিমেনেস। ছবি: রয়টার্স।
চতুর্থ বিশ্বকাপে এসে প্রথম গোলের পর এবার আরও একটি গোল যোগ করলেন রাউল হিমেনেস। ছবি: রয়টার্স। Credit: bangla.bdnews24.com

বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে জোয়েল ওর্দানেস সরাসরি দিয়ে বসেন হিমেনেসকে। তিনি কিনিয়োনেসের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে বক্সের একটু ভেতরে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে দারুণ শটে বল জালে জড়ান পোস্ট ঘেঁষে। ইকুয়েডরকে তখন ছন্নছাড়া মনে হচ্ছিল। তবে ৩৫ মিনিটের পর থেকে তারা একটু গুছিয়ে নেয়। ৪০তম মিনিটে ইবোয়ার জোরাল শট লাফিয়ে ফিরিয়ে দেন রাউল রাহনেল। ৪২তম মিনিটেও কর্নার করে দলকে রক্ষা করেন মেক্সিকোর গোলকিপার। পাল্টা আক্রমণে ৪৫তম মিনিটে হিমেনেসের ভলি চলে যায় ওপর দিয়ে।

দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ২০ মিনিটে বল নিয়ন্ত্রণে বেশি রাখে ইকুয়েডর। তবে তেমন কোনো পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি কোনো দল। ৬৭ মিনিটে সম্ভাবনা জাগায় মেক্সিকোসেসার মন্তেসের হেড অসাধারণ রিফ্লেক্সে এক হাতে বাইরে পাঠিয়ে দেন ইকুয়েডরের গোলকিপার এর্নান গালিন্দেজ। সেখান থেকে পাওয়া কর্নারে জোহা ভাস্কেসের হেড চলে যায় একটু বাইরে দিয়ে। ইকুয়েডর চেষ্টা করে গেছে, কিন্তু মেক্সিকোর রক্ষণের দৃঢ়তায় তারা পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজার পর গ্যালারির চিৎকারের মধ্যে মাঠে বাঁধনহারা উদযাপনে মেতে উঠল গোটা দল।

ইকুয়েডর কোচ বেকাচেচে ঘোষণা করেন, ‘আমাদের দল ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত। যে কাজের মাধ্যমে আমরা এখানে এসেছি, তার ওপর আমার আস্থা আছে। আমরা আমাদের লড়াকু ও অদম্য মানসিকতা তুলে ধরতে চাই।’ তিনি আরও যোগ করেন, দলটি যেকোনো জায়গায় খেলতে সক্ষম এবং উচ্চতার কারণে বিশেষ কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট। ইকুয়েডর কোচ বলেন, ‘দলের সাথে আমরা বিশ্বকাপটা এতটাই উপভোগ করছি যে, আরও কিছুদিন এখানে থেকে যেতে চাই।’

মেক্সিকোর এই জয় তাদের ৪০ বছর আগের বিশ্বকাপ নকআউট জয়ের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যা ১৯৮৬ সালে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে হয়েছিল।

Read Also

Source: prothomalo.com