বিশ্বকাপে নরওয়ের অনন্য রেকর্ড এবং ব্রাজিলের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি

বিশ্বকাপে অনন্য নজির গড়ল নরওয়ে

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে। এই জয়ের পাশাপাশি স্টলে সুলবাকেনের দল ইতিহাসের পাতায় একটি অনন্য রেকর্ডও গড়েছে। শুরুর একাদশ ঘোষণার সময় নরওয়ে বিশ্বকাপে একটি বিশেষ রেকর্ডের মালিক হয়েছে।

গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের বিপক্ষে নিয়মিত খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে একাদশে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ স্টলে সুলবাকেন। এরপর শেষ ষোলোতে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে তিনি আবারও প্রথম একাদশে অন্তত ১০টি পরিবর্তন করেন। এর ফলে নরওয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে টানা দুই ম্যাচে শুরুর একাদশে অন্তত ১০টি পরিবর্তন আনার রেকর্ড গড়েছে।

এই ম্যাচে নরওয়ের হয়ে গোল করে আরও একটি ইতিহাস গড়েছেন আন্তোনিও নুসা১৯৩৮ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নরওয়ের হয়ে গোল করা প্রথম ফুটবলার তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৩৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব ছিল না; প্রতিযোগিতা সরাসরি শেষ ষোলো থেকে শুরু হয়েছিল।

নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওদেগার্ডও একটি বিশেষ তালিকায় নিজের স্থান করে নিয়েছেন। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম তিনটি ম্যাচের প্রতিটিতেই অন্তত একটি করে গোলে অবদান রেখে তিনি ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ফুটবলার হয়েছেন। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ইগর বেলানভ (১৯৮৬) এবং জার্মানির মাইকেল বালাক (২০০২)।

গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছেন আর্লিং হালান্ড। এই বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন পাঁচ। তার চেয়ে বেশি গোল রয়েছে কেবল কিলিয়ান এমবাপ্পেলিওনেল মেসির, যাদের দুজনেরই গোল ছয়টি করে।

শুধু বিশ্বকাপ নয়, প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলেও হালান্ড দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। নরওয়ের জার্সিতে টানা ১৩টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে গোল করে এই সময়ে তিনি মোট ২৫টি গোল করেছেন। এর মধ্যে মালদোভা, ইসরায়েল, এস্তোনিয়ার মতো দলের বিপক্ষে গোল আছে। তবে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ইতালিকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচে জোড়া গোলও আছে তার। ওই জয়েই ২০০০ সালের ইউরোর পর বড় কোনো টুর্নামেন্টে প্রথমবার জায়গা করে নেয় নরওয়ে

এরপর ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ অভিষেক রাঙান হালান্ডসেনেগালের বিপক্ষে পরের ম্যাচেও করেন জোড়া গোল। টানা দুই জয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় নরওয়ে

কিলিয়ান এমবাপের বিপক্ষে হালান্ডের বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই দেখা যায়নি কোচের সিদ্ধান্তে। ফ্রান্সের বিপক্ষে তারকা স্ট্রাইকারকে খেলাননি সুলবাকেনআইভরি কোস্টের বিপক্ষে ফিরে তীব্র স্নায়ু চাপের শেষ সময়ে ব্যবধান গড়ে দেন হালান্ডডালাসে স্রেফ ১০টি পাস দেন তিনি, এর আটটি ছিল সফল। ম্যাচে কেবল ২৭বার বল স্পর্শ করেন তিনি, এর প্রায় অর্ধেক নিজেদের অর্ধে।

হালান্ডের গোলগুলো হয়তো দর্শনীয় হয় না কিন্তু এগুলো সহজাত প্রবৃত্তি, মুভমেন্ট ও নিখুঁত টাইমিংয়ের মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত। দেশের হয়ে পেনাল্টি থেকে তার গোল কেবল ছয়টি। তার গোলগুলো আসে একদম ঠিক সময়ে, যেমনটা হয়েছে আইভরি কোস্ট ম্যাচে।

হালান্ডের জন্য কোনো প্রশংসাই যেন যথেষ্ট মনে হচ্ছে না কোচ সুলবাকেনের। তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপ বাছাই পেরিয়ে মূল পর্বে নরওয়ের জায়গা করে নেওয়ার মূল কারণের একটি হালান্ড। আজকের জয়ের কারণও তিনি। যে কারো চেয়ে অনেক এগিয়ে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হালান্ড। তিনি নরওয়ের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেও তাই থাকবেন। নরওয়ের মতো ছোট দেশের হয়ে তিন ম্যাচে পাঁচ গোল করা এমন একজন খেলোয়াড়কে তিনি কারও সঙ্গেই বদল করবেন না।

বর্তমান সময়ের কেউ দেশের হয়ে গোলের হারে হালান্ডের ধারে কাছে নেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, নরওয়ের হয়ে কত গোল করতে পারেন হালান্ড? বিসিবি একটি হিসাব করেছে। উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কথাই ধরা যাক। পর্তুগিজ মহাতারকা ২৩১ ম্যাচে করেছেন ১৪৫ গোল। প্রতি ১.৫৯ ম্যাচে তিনি করেছেন একটি গোল। আর সেখানে হালান্ড ০.৮৮৮ ম্যাচে করছেন একটি গোল।

এর অর্থ, এভাবে চালিয়ে যেতে থাকলে ১২৮ ম্যাচে রোনালদোর বর্তমান সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবেন হালান্ড। প্রতি বছর বাছাই, প্রীতি ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট মিলিয়ে যদি হালান্ড দেশের হয়ে ১০ ম্যাচ খেলেন, তাহলে সাত বছরের একটু বেশি সময়ে রোনালদোর রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার কথা তার। অর্থাৎ ৩২ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল হতে পারে তার, যেটি তিনি অর্জন করতে পারেন রোনালদোর চেয়ে প্রায় ১০ বছর কম বয়সে। এভাবে চালিয়ে গেলে, ৪১ বছর বয়সে হালান্ড ২৬০ গোল করতে পারেন। তবে এটি কেবল একটি অনুমান।

ব্রাজিলের মুখোমুখি নরওয়ে

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শুরুতেই বিশ্বফুটবল এক রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানের লড়াই দেখার অপেক্ষায়। শেষ ষোলোর মঞ্চে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের পরাশক্তি নরওয়ে। আপাতদৃষ্টিতে ম্যাচটিতে ব্রাজিল ফেবারিট মনে হলেও, ইতিহাস ও পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলছে। বিশ্বফুটবলে নরওয়ে এমন এক প্রতিপক্ষ, যাদের বিপক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয়ের মুখ দেখেনি ব্রাজিল

আগামী ৫ জুলাই দিবাগত বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে নরওয়েব্রাজিল। কাগজে-কলমে ব্রাজিলকে এগিয়ে রাখলেও অতীতের পরিসংখ্যান ভিন্ন গল্প বলছে। এখন পর্যন্ত চারবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। এর মধ্যে দুটি ম্যাচ জিতেছে নরওয়ে, বাকি দুটি ড্র হয়েছে। অর্থাৎ, নরওয়ের বিপক্ষে এখনো জয়হীন ব্রাজিল

দুই দলের প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের একটি প্রীতি ম্যাচে। সেই ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়। এরপর ১৯৯৭ সালের আরেকটি প্রীতি ম্যাচে ৪-২ ব্যবধানে ব্রাজিলকে হারিয়ে চমকে দেয় নরওয়ে

দুই দলের সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইটি হয়েছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। কিয়েতিল রেকদালের শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছিল নরওয়ে। এরপর ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে সর্বশেষ দেখায়ও ১-১ গোলে ড্র করে দুই দল। সেই থেকে আর মুখোমুখি হয়নি তারা।

এবারের নরওয়ে দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আর্লিং হালান্ডআইভরি কোস্টের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে জাতীয় দলের হয়ে নিজের গোলসংখ্যা ৬০-এ উন্নীত করেছেন এই তারকা স্ট্রাইকার। তার সঙ্গে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন তরুণ উইঙ্গার আন্তোনিও নুসা

অন্যদিকে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে রয়েছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, রদ্রিগো, ম্যাথেউস কুনিয়া এবং অভিজ্ঞ নেইমারজাপানের বিপক্ষে নাটকীয় জয় আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে কার্লো আনচেলত্তির দলের। এবার তাদের লক্ষ্য শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নয়, নরওয়ের বিপক্ষে দীর্ঘদিনের জয়খরাও ঘোচানো।

Read Also

Source: bd-pratidin.com